নবী প্রেম কি ও কেন

বিজয় বাংলা
প্রকাশিত ২১, অক্টোবর, ২০২১, বৃহস্পতিবার
নবী প্রেম কি ও কেন

 

عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ((لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحبَّ إليه من ولده ووالده والناس أجمعين)) .

وفي رواية لمسلم : ((حتى أكون أحبَّ إليه من أهله وماله والناس أجمعين)).

 

হযরত আনাস বিন মালিক (রাজিঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ততক্ষণ ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, পিতা এবং অন্য সকল লোক থেকে বেশী প্রিয় হব”। – বুখারী।

মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় আছে- “ … … যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পরিবার, সম্পদ এবং অন্য সকল লোক থেকে বেশী প্রিয় হব”। -মুসলিম।

 

তাখরীজুল হাদীসঃ

হাদীসটি ইমাম আহমদ ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে (১২৪০৩), ইমাম দারিমী ‘সুনান’ গ্রন্থে (২৭৪১), ইমাম বুখারী ‘আল জামিউস সহীহ’ গ্রন্থে (১৪), ইমাম মুসলিম ‘সহীহ মুসলিম’ গ্রন্থে (৪৪), ইমাম নাসায়ী ‘সুনান’ গ্রন্থে (৫০১৩), ইমাম ইবনু মাজাহ ‘সুনান’ গ্রন্থে (৬৭), ইমাম তাবরানী ‘আলমু’জাম’ গ্রন্থে (৮৮৫৪) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাজিঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।

 

রাবী পরিচিতিঃ

এই হাদীস টি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি হলেন আবু হামযা আনাস ইবনু মালিক ইবনু নাদ্বার আল খাযরাজী আল আনছারী। হিজরতের দশ বছর পূর্বে মদীনা শরীফে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। দশ বছর বয়সে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খাদেম নিযুক্ত হন এবং দশ বছর পর্যন্ত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতের সৌভাগ্য লাভ করেন। তাঁকে নবী পরিবারের একজন সদস্য মনে করা হত। তিনি কাতেবে ওহী ছিলেন। ছোট কাল থেকেই লেখা পড়া এবং হাদীস মুখস্ত করা তাঁর অভ্যাস ছিল। তিনি ছিলেন সাহবীদের মধ্যে ‘মুকছিরীন ফিল হাদীস’ অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অধিক হাদীস বর্ননা কারী সাহাবীদের অন্তর্ভূক্ত। মুহাদ্দিসগণের হিসাব মতে তিনি ২২৮৬ টি বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রায় ৮ টি যুদ্ধে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ছিলেন। ৯৩ হিজরীতে ওলীদ ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে তিনি ইন্তেকাল করেন।

 

হাদীসের ব্যাখ্যাঃ

এবার আসুন, আমরা হাদীসের ব্যাখ্যা টা একটু জানার চেষ্টা করি ৷ এখানে যে বিষয় টা বিশেষ ভাবে উল্লেখ হয়েছে , তাহল নবীপ্রেম ৷ সুতরাং আমাদের কে ভাল ভাবে বুঝতে হবে নবীপ্রেম কী ও কেন?

 

নবী প্রেম কেন?

এই হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ভালবাসা রাখা সকল মুসলিম নর নারীর উপর ফরয। বরং শর্তে ঈমান। অর্থাৎ অন্তরে রসূলপ্রীতি না থাকলে তার ঈমান পরিপূর্ণ হবে না। এই ভালবাসা টি হতে হবে আল্লাহ ব্যতীত পৃথিবীর সব কিছুর চেয়ে বেশী। বুখারী ও মুসলিম এর বর্ণনা মতে নিজ, নিজের সন্তান, পিতা-মাতা, পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ এবং বাকী সকল লোকদের থেকে অনেক বেশী হতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম বলেনঃ একদা আমরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তিনি উমর (রাজিঃ) এর হাত ধরে ছিলেন। উমর বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমার কাছে আমার নিজ ব্যতীত বাকী সব থেকে অধিক প্রিয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ সেই সত্ত্বার শপথ করে বলছি যাঁর হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, তুমি ততক্ষণ পরিপূর্ণ মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তোমার প্রাণের চেয়েও তোমার কাছে বেশী প্রিয় হব। পরে উমর (রাজিঃ) বললেনঃ এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশী প্রিয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাহলে এখন তুমি পরিপূর্ণ মু’মিন। (বুখারী, কিতাবুল ঈমান, ৫৩২, ৬৬৩২।)

 

যাদের অন্তরে রসূলের প্রতি ভালবাসা সব চেয়ে বেশী হবে না তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কঠোর ভাষা ব্যবহার করে বলেছেন তারা যেন শাস্তির অপেক্ষায় থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না’। (সূরা তাওবাঃ ২৪)

 

তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম যে, নবী কে ভালবাসা এত প্রয়োজন কেন? কারণ নবীর প্রতি ভালবাসা না থাকলে তার ঈমান পরিপূর্ণ হবে না। সতরাং রসূলপ্রীতি ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ও ঈমানের পূর্ব শর্ত।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ভালবাসার উপকারিতা অনেক বেশী। যারা রসূলকে ভালবাসবে তারা

(১) আল্লাহর ভালবাসা লাভে ধন্য হবেন।

(২) আল্লাহ তাআলা তাদের পাপ মোচন করে দিবেন।

(৩) কিয়ামতের দিন রসূলের সাথে জান্নাতে থাকার সৌভাগ্য লাভ করবেন।

(৪) ঈমানের স্বাদ লাভে ধন্য হবেন।

(৫) আল্লাহর শাস্তি মুক্ত থাকবেন।

এরূপ আরো অনেক উপকারের কথা কুরআন হাদীসে পাওয়া যায়।

 

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদেরকে ভালবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু’। (সূরা আলে ইমরান-৩১)

হযরত আনাস (রাজিঃ) বলেনঃ এক ব্যক্তি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! কিয়ামত কবে হবে? বললেনঃ তুমি কিয়ামতের জন্য কি তৈরী করেছ? লোকটি বললঃ ‘আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের ভালবাসা’। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তার সাথে থাকবে। (সহীহ মুসলিম-২০৩৩)

 

নবী প্রেম কি?

এবার আসুন ‘নবী প্রেম’ বলতে কি বুঝায় এবং তার আলামতগুলো কি তা একটু জানার চেষ্টা করি। কারণ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন। এখন তিনি দুনিয়াতে নেই। তাহলে আমরা তাঁকে কিভাবে ভালবাসতে পারি? এর উত্তর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেনঃ ‘যে আমার সুন্নাত তথা জীবন যাপনের নিয়ম নীতি কে ভালবাসবে সে আমাকে ভালবাসবে’। (তিরমিযী মিশকাতঃ ১/১৭৩)

তিনি আরো বলেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরাবে সে আমার থেকে নয়’। (সহীহ আল জামেঃ ৪৯৪৬)

 

তাহলে বুঝা গেল যে, নবীপ্রেম মানে তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করা। অতএব আমাদের দরকার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাতের পুরাপুরী অনুসরণ করা। প্রত্যেক জিনিসে দেখতে হবে -এটি সুন্নাত কি না? কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াস তথা শরীয়তের দলীল দ্বারা প্রমাণিত আছে কি না? কারণ শরীয়তের দলীল দ্বারা প্রমাণিত নেই এমন কাজ কে দ্বীন মনে করে ছাওয়াবের আশায় করার নামই বিদাত। বিদাতী কাজগুলোকে নবীপ্রেমের নিদর্শন বা আলামত বলা আর যারা করে না তাদেরকে ওহাবী নবীর শত্রু বলে গালী দেওয়া দৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা সুন্নাতের পরিবর্তে বিদাতকে প্রধান্য দেয় তারা কোন দিন নবী প্রেমিক হতে পারে না। বরং কিয়ামত দিবশে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ লোদেরকে উম্মত বলে স্বীকার করবেন না এবং হাউযে কাউছার থেকে তাড়িয়ে দিবেন। সুতরাং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলিম নর নারীকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণের মাধ্যমেই তাঁর ভালবাসার প্রমাণ দিতে হবে।

ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।

মুহাম্মাদ হারুন আযিযী নদভী

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন