বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২৪, মে, ২০২২, মঙ্গলবার

বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩০০ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বর্তমানে দেশীয় বাজার থেকে স্যাটেলাইট কোম্পানি প্রতি মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় করছে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আয় নিয়ে গত সপ্তাহে বিবিসি বাংলায় যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে কোম্পানির ‘প্রকৃত চিত্র’ প্রতিফলিত হয়নি বলে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি জানিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ ৩৮টি টিভি চ্যানেল এই স্যাটেলাইটের সেবা নিচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ বেতার এবং ডিটিএইচ অপারেটর ‘আকাশ’ এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

গত ১৪মে বিবিসি বাংলায় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট: তিন বছর আয় করতে পারেনি, খরচ উঠবে কবে’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সেই সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড।

”প্রতিবেদনটিতে কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসায়িক চিত্র প্রতিফলিত হয়নি, যার ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে,” কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ রফিকুল হক স্বাক্ষরিত প্রতিবাদপত্রে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। এর মাধ্যমে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ থাকা দেশগুলোর তালিকায় যোগ হয় বাংলাদেশের নাম। এর আগে বিশ্বের ৫৬ দেশ মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে ন্যাশনাল প্রাইড বা জাতীয় গৌরবের অংশ হিসেবেই দেখছে।

দেশীয় বাজার তৈরিতে মনোনিবেশ
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) পক্ষ থেকে মঙ্গলবার বিবিসি বাংলার কাছে ওই সংবাদের প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়।

সেখানে বলা হয়েছে, ”বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে বক্তব্য দেয়া হলেও, প্রকৃতপক্ষে শফিকুল ইসলাম ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তিন বছর আয় করতে পারেনি’, এরকম কোন বক্তব্য দেননি।”

”বিবিসি বাংলার একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, প্রাথমিক পরিকল্পনার (২০১২ সালে তৈরি পরিকল্পনা) তুলনায় ২০১৮ সালে স্যাটেলাইট উড্ডয়নের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যান্ডউইথের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্যাটেলাইট কোম্পানি দেশীয় বাজার তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে এবং কিছু ফলাফল আসা শুরু হয়েছে,” প্রতিবাদ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ”বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তিন বছরে কোন আয় করতে পারেনি”, কথাটি সঠিক নয়, বরং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বিগত তিন বছর যাবত আয়ের ধারায় রয়েছে।

ইতোমধ্যেই কোম্পানির মোট আয় ৩০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। বর্তমানে কোম্পানির মাসিক আয় প্রায় ১০ কোটি টাকা, যার প্রায় পুরোটাই দেশীয় বাজার থেকে অর্জিত হচ্ছে।”

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চাহিদার তুলনায় বৈশ্বিক বাজারে স্যাটেলাইট ব্যান্ডউইথের সরবরাহ বেশি থাকায় এবং কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিদেশের বাজারে স্যাটেলাইট-১ এর বিপণন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির উন্নতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে বিপণন কর্মকাণ্ড শুরু করেছে কোম্পানিটি।

স্যাটেলাইট দিয়ে বিভিন্ন সেবা
কোম্পানিটি জানিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ ৩৮টি টিভি চ্যানেল ও বাংলাদেশ বেতার, ডিটিএইচ অপারেটর ‘আকাশ’ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ব্যবহার করছে। যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেল এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সম্প্রচার শুরু করেছে, যার মাধ্যমে বিদেশের বাজারে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে কোম্পানির।

এছাড়া বাংলাদেশের দুটি ব্যাংক এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে এটিএম সেবা দিতে শুরু করেছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা এই স্যাটেলাইটের সেবা নেয়ার ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।

এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে বাংলাদেশের ৩১টি দুর্গম ও প্রত্যন্ত দ্বীপাঞ্চলে ১১২টি স্থানে টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিএসসিএল।

কোম্পানি আশা করছে, যেসব রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সেবা দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা চলছে, তা সফল হলে দেশীয় বাজারে এই স্যাটেলাইটের বৃহৎ গ্রাহক গোষ্ঠী তৈরি হবে এবং এ থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ও সম্ভব হবে।

২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ এবং উৎক্ষেপনের পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় দুই হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

উৎক্ষেপণের সময় থেকে স্যাটেলাইটটির মেয়াদকাল ১৫ বছর বলা হলেও মেয়াদকাল আরও তিন বছর বাড়িয়ে ১৮ বছর সম্প্রসারিত করা সম্ভব বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান ১১৯.১ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথে। এর ফুটপ্রিন্ট বা কভারেজ হবে ইন্দোনেশিয়া থেকে তাজিকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত।

শক্তিশালী কেইউ ও সি ব্যান্ডের মাধ্যমে এটি সবচেয়ে ভালো কাভার করবে পুরো বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশসমূহ, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া।

পনের বছরের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে অরবিটাল স্লট কেনা হয়েছে। তবে বিএস ওয়ানের স্থায়িত্ব হতে পারে ১৮ বছর পর্যন্ত।

তিন দশমিক সাত টন ওজনের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির ডিজাইন এবং তৈরি করেছে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস। আর যে রকেট এটাকে মহাকাশে নিয়ে যাচ্ছে সেটি বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন