সূরা আল কাহফ এর সারাংশ

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২৪, জুলাই, ২০২৩, সোমবার
সূরা আল কাহফ এর সারাংশ

সৈয়দ আনোয়ার আব্দুল্লাহ

 

বিষয়ঃ ফিতনা থেকে সুরক্ষা।

????সূরা কাহফে আছেঃ
[ক] চারটা গল্প।
[খ] চারটা ফিতনা।
[গ] চারটা মুক্তির ফর্মুলা

☑ প্রথম গল্প ও ফেতনাঃ

দ্বীনী ফিতনাঃ
আসহাবে কাহাফের গল্প: ফিতনা থেকে ঈমান বাঁচাতে একদল যুবক নিজ শহর থেকে হিজরত করে একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হিজরতের পর ঈমানী পরিবেশ কায়েমের ফলশ্রুতিতে এবং জামাতবদ্ধ থাকার কারণে যুগের ফেতনা থেকে আল্লাহ কুদরতিভাবে তাদের হেফাজত করেছেন এবং নিরাপদে রেখেছেন। সেখানে ৩০৯ বছর তারা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিল। জেগে দেখলো পুরো জনপদ মুসলমান হয়ে গেছে।

এই ঘটনায় শিক্ষণীয় বিষয় হলো, সমাজে শিরক, বেদাত, কুসংস্কারের ভয়াবহ ফেতনায় ঈমান বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়লে মুমিন বান্দার উচিত হবে, সত্যের উপর অবিচল থাকার জন্য প্রথমত জামাতবদ্ধ হয়ে হিজরত করা এবং ঈমানী পরিবেশে মুমিন বান্দাদের সাথে নিজেকে জুড়িয়ে রাখা। তাহলে শেষ যামানাতেও প্রচণ্ড ফেতনার মাঝে আসহাবে কাহাফের যুবকদের মত আল্লাহর গায়েবী মদদ ও নুসরত অনবরত বর্ষিত হতে থাকবে।

◾মুক্তির প্রথম ফর্মুলা- ৩টি।
১। জামাতবদ্ধ থাকা। সূরা কাহাফে আল্লাহ তা’আলা কোন একজন ব্যক্তির আলোচনা না করে একদল জামাতবদ্ধ মুমিন বান্দার আলোচনা করেছেন। সকল যুগের ফেতনা থেকে মুক্তির প্রথম ফর্মূলা হলো, দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে সমমনাদের একত্রিত করে জামাতবদ্ধ থাকা।
২। হিজরত করা। (ফিতনা থেকে বাঁচতে মুমিন বান্দারা জামাতবদ্ধ হয়ে হিজরত করা।)
৩। ঈমানী পরিবেশ তৈরী করে সেখানে অবস্থান করা।

প্রথম ফর্মূলার সারাংশ: দাওয়াত ও হিজরতের দ্বারা ঈমানের হেফাজত হয় এবং ঈমানী পরিবেশে জামাতবদ্ধ থাকার কারণে মানুষ তো বটেই সৎসঙ্গের প্রভাবে কুকুর পর্যন্ত সম্মানিত হয়েছে। ২৮ নং আয়াত

☑ দ্বিতীয় গল্প ও ফিতনাঃ

দুনিয়াবী ফিতনাঃ
দুই বাগিচার মালিকের গল্প: সন্তান ও সম্পদ তথা দুনিয়ার ফিতনা। আল্লাহ এক লোককে প্রচুর দুনিয়াবী নেয়ামত দান করলেন। তার একজন মুমিন সাথী তাকে বারবার আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিয়ে নেয়ামতের কথা স্মরণ করে দেওয়ার পরও ধনী ব্যক্তিটি অস্বীকার করে। সে মুখে ইলাহ আর প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহর কথা স্বীকার করলেও অন্তরে ইলাহের জায়গায় স্রষ্টার স্থান ছিলো না, ছিলো সৃষ্টির। ঈমানী মেহনতের মাধ্যমে শিরকমুক্ত ঈমান অর্জন না করার ফলে দুনিয়ার চীজ-আসবাবের ফেতনা তাকে গ্রাস কওে ফেলবে। এমনকি দুনিয়ার মাল-দৌলতের মুহাব্বত তাকে ঈমানহারা করে ফেলবে।

তার অন্তওে আল্লাহর বদলে মাল সম্পদ ও দুনিয়ার চিজ আসবাবের প্রতি ইয়াকীন বেশি ছিল। আল্লাহ শাস্তি হিসেবে তার বাগান ধ্বংস করে দেয়ার পর ৪২ নং আয়াতের শেষাংশে তার মন্তব্য পড়লে অবাক হতেই হবে।

◾◾মুক্তির দ্বিতীয় ফর্মুলা- ৩টি।
১। দাঈর কথাকে গুরুত্ব দেওয়া। (ফেতনায় জড়িয়ে পড়ার পর কোন দাঈ নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলে তা গুরুত্ব সহকাওে মেনে নেওয়া।)
২। সর্বাবস্থায় আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। কেননা, আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার বিভিন্ন নেয়ামত দিয়ে বান্দাকে পরীক্ষা করেন।
৩। দাওয়াতের মেহনত করে শিরিকমুক্ত ঈমান তৈরী করা মুমিনের র্কতব্য। ৪৫ নং আয়াত।

☑তৃতীয় গল্প ও ফিতনাঃ

ইলমের ফিতনাঃ
হযরত মূসা ও খিযির আলাইহিমাস সালামের গল্প: খিযির আলাইহিস সালামের একের পর এক অদ্ভুত কান্ড দেখে মুসা আলাইহিস সালাম আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়ছিলেন। খিযির আলাইহিস সালাম এমনসব কাজ করছিলেন, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যার কোন যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই। এদিকে, সবকিছু ধৈর্য সহকারে পর্যবেক্ষণ করা এবং বিনাবাক্য-ব্যয়ে দেখে যাওয়ার শর্তে খিযির আলাইহিস সালামের সফর-সাথী হওয়ার পরেও বারংবার তাহকীক করার বাসনা নিয়ে সফর করছিলেন মুসা আলাইহিস সালাম। তিনি প্রতিটি ঘটনায় হতবাক হচ্ছিলেন আর প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন খিযির আলাইহিস সালামকে। শেষে খিজির আলাইহিস সালাম নিজের কাজগুলোর ব্যাখ্যা মুসা আলাইহিস সালামকে বুঝিয়ে বলেন। আর্শ্চয হয়ে মুসা (আ) বুঝতে পারেন বাহ্যিক জ্ঞানের পাশাপাশি অন্তর্জ্ঞান প্রয়োজন।

দাজ্জাল এক চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু সত্যিকারের অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞানীরা দুইচোখ দিয়ে দেখেন। অর্থাৎ তাদের জ্ঞানের উৎস দুটি। প্রথমটি হলো ইলমে জাহির, বা বাহ্যিক জ্ঞান। যা র্নিভর করে বস্তুজগতের অনুসন্ধান, তথ্য-প্রযুক্তি ও নেট-দুনিয়ার চমকপ্রদ ফাঁদ এবং আন্তঃজালীয় প্রয়োগের উপর। যাকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা বিজ্ঞান বলা হয়। যার গন্ডি খুবই সীমিত। দাজ্জাল মূলত সেই এক চোখা বাহ্যিক জ্ঞানের ফাঁদে ফেলেই মানুষকে ধোকা দিতে চাইবে। দ্বিতীয়টি হলো, ইলমে বাতিন বা আধ্যাত্বিক জ্ঞান। যে জ্ঞানের সাথে বাসিরত তথা অন্তদৃষ্টির সর্ম্পক নিহিত। এতে সত্য- মিথ্যার ফারাক বুঝা যাবে সহজে। এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ এই উম্মতকে বুঝিয়ে দিলেন, শেষ জামানায় দাজ্জালের ফেতনার সময়ে মানুষ শুধু বাহ্যিক জ্ঞানকেই অর্থাৎ চর্মচক্ষুর পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক বস্তুবাদী জ্ঞানকেই শুধু মূল্যায়ন করবে। আর অন্তর্চক্ষুর অন্ধত্বের ফলে অন্তর্জ্ঞানহীন হয়ে গিয়ে অন্ধ আর দাজ্জালের মতোই এক চোখা হয়ে যাবে। সত্য মিথ্যা আলাদা করতে পারবে না। একচোখা নীতিতে বাহ্যিক বিভিন্ন জিনিস দেখেই শেষ জামানার ফিতনার জালে জড়িয়ে পড়বে।

◾ মুক্তি তৃতীয় ফর্মুলাঃ
১। বাতেনী ইলম তথা আধ্যাতিকতা অর্জন। (বাসিরত তথা গভীর অন্তরজ্ঞানের মাধ্যম ছাড়া কেবল বাহ্যিক ইলম দিয়ে শেষ জামানার দাজ্জালি ফেতনা থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। আর বাসিরত তথা অন্তর্দৃষ্টির ইলম কখনো সহবত ছাড়া অর্জিত হয় না। যা মূসা আলাইহিস সালাম সফর করতে করতে খিযির আলাইহিস সালামের সহবতে থেকে হাসিল করেছেন।
২। সবর ও ধৈর্য। (মূসা আলাইহিস সালাম বাহ্যিক দৃষ্টিতে অসঙ্গতিপূর্ণ একের পর এক হালত দেখেও অধৈর্য্য হন নি। বরং সবরের সাথে খিযির আলাইহিস সালামের সহবতে চলছিলেন। অতএব, শেষ যামানায় বাঁচতে হলে ধৈর্য ও সবরের সাথে যুগের ফিতনাকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে)
৩। তাহক্বীক করা। (মূসা আলাইহিস সালাম কোন একচোখা নীতি অবলম্বন করেন নি। একের পর এক আশ্চর্যজনক ঘটনা দেখে অবাক ও বিস্মিত হলেও হাল ছাড়েন নি। বারবার অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ দেখার পরও বিষয়গুলো সর্বোচ্চ তাহকীক করেছেন এবং হাকীকত জেনে তা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন।) অতএব, দাজ্জালী ফিতনার চমক ও ছোবল থেকে বাঁচতে হলে প্রতিটি পদক্ষেপে তাহকীক করে চলতে হবে।

☑ চতুর্থ গল্প ও ফিতনাঃ
ক্ষমতার ফিতনাঃ
যুলকারনাইন: এক মহান সম্রাট এর গল্প। যিনি একাধারে ইলম ও ঈমানের অধিকারী ছিলেন। দ্বীনের জন্য যিনি সমগ্রবিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন।
আল্লাহর আদেশে তিনি ইয়াজুজ মাজুজ নামক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এক ভয়ংকর জাতিকে বিশাল এক প্রাচীর তৈরী কওে বন্দী করে ফেলেছিলেন। যাতে মুমিন বান্দাদের মাঝে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে না পারে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আসহাবে কাহাফের যুবকদের বিতাড়িতকারী জালেমদের উপর যুলকারনাইনের বিজয়কে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। আল্লাহর দেওয়া দুনিয়াবী নেয়ামত ক্ষমতার সদ্ব্যাবহার করেছেন। তিনি ইলমের ফিতনার উর্পর জয়লাভ করেছেন।

◾মুক্তির চতুর্থ ফর্মুলাঃ ৩টি।
১। প্রাচীর তৈরী। একদল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী জনগোষ্ঠীকে তিনি প্রাচীর তৈরী করে বিচ্ছিন্ন করে দেন। যাতে করে তারা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর ফাসাদ সৃষ্টি ও তাদের কল্যাণের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। শেষ যামানাতে ফিতনা থেকে বাঁচতে হলে বিপর্যয় ও অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে যুলকারনাইনের মত দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য প্রাচীর তৈরী করে নিজেদের হেফাযত করতে হবে।
২। আল্লাহর সাহায্য। ক্ষমতা ও ইলমের সদ্ব্যবহারের কারণে আল্লাহ তা’আলা তাকে বিপর্যয়সৃষ্টিকারীদের মুকাবেলায় গায়েবী সাহায্য করেছেন। ইলম ও শক্তির সহীহ ব্যবহারের মাধ্যমে ইখলাসওয়ালাদেরকে আল্লাহ তা’আলা কঠিনতম কাজেও সাহায্য করেন এবং তাদের মাধ্যমে কঠিন কঠিন ফেতনাকেও নির্মূল করেন।
৩। বিপর্যয়কারীদের ব্যর্থতা। সংখ্যায় হাজারগুণ বেশি হলেও ইখলাসওয়ালাদেও সামনে বিপর্যয়কারীদের ব্যর্থতা অনিবার্য। সহীহ বুখারির ৬৫৩০নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এই শেষ সময়ের মানুষের মধ্যে প্রতি হাজারে ৯৯৯ জন হবে ইয়াজুজ-মাজুজ।

????কিছু কথাঃ

সূরার মাঝখানে দেখা গেছে, ইবলিসই হলো ফিতনার সঞ্চালক।
[ তোমরা কি তাকে ও তার বংশধরদের কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ আমাকে ছাড়া অথচ তারা তোমাদের শত্রু। জালিমদের জন্যই তা কত নিকৃষ্ট বিনিময়।আয়াত ৫০]

আল্লাহ তা’আলা আমাদের বুঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন