পাশ্চাত্য এবং ইসলাম

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৪, ডিসেম্বর, ২০২১, মঙ্গলবার
<strong>পাশ্চাত্য এবং ইসলাম</strong>

আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদঃ খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীকে প্রাচীন গ্রিসের প্রারম্ভ ধরা হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রিসে বেশ কজন বিখ্যাত দার্শনিক জন্ম নেন। যেমন : পিথাগোরাস (খ্রিস্টপূর্ব ৫৭২-৪৯৭) সক্রেটিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০-৩৯৯) প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭-৩৪৭) অ্যারিস্টটল (খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪-৩২২) এপিকিউরাস (খ্রিস্টপূর্ব ৩৪১-২৭০)।

এসকল দার্শনিকের মাধ্যমে গ্রিসে দর্শন, রাজনীতি, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদে এক নয়া আলোড়ন সৃষ্টি হয়। একইসাথে ধর্মদ্রোহীতা ফুলেফেঁপে ওঠে। ধর্ম সংস্কারের জোর দাবিও উঠতে শুরু করে। যেকেউ ধর্মকে সমালোচনার বস্তুতে পরিণত করতে শুরু করে।

খ্রিস্টপূর্ব২১৪ সন থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬ সন পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্যের সাথে গ্রিসের প্রজাতান্ত্রিক সরকারের যুদ্ধ চলমান ছিল। ১৪৬ খ্রিস্টপূর্বে চতুর্থ ম্যাসেডোনিয়া যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে গ্রিক প্রজাতন্ত্র রোমান সাম্রাজ্য অধিকার করে।

গ্রিসদের প্রতিপত্তি রোমান সভ্যতার ওপর প্রভাব ফেলে। আস্তে আস্তে রোমান সভ্যতায় গ্রিক সভ্যতা মিশে যায়। রোমানরা গ্রিক দার্শনিক প্লেটো, অ্যারিস্টটলের চিন্তাধারা গ্রহণ না করলেও অন্য গ্রিক দার্শনিকদের চিন্তাধারা গ্রহণ করতে শুরু করে—বেছে বেছে, সুবিধামত। গ্রিক সভ্যতার সংমিশ্রণে রোমান সভ্যতা তখন এমন এক সভ্যতায় পরিণত হয়, যার মৌলিক অংশ হয়ে যায় বিলাসিতা এবং মনচাহি জিন্দেগী।

মনুষ্য প্রবৃত্তিকে ভিত্তি করে তৈরি সংবিধানের ওপর চলতে থাকে রোমান সাম্রাজ্য। একের পর এক ক্ষমতাগ্রহণ এবং ক্ষমতাচ্যুত গল্পের মধ্য দিয়ে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে পৌঁছে রোমান সাম্রাজ্য। রোমান সাম্রাজ্যকে তখন চার ভাগে ভাগ করে চারজন শাসক নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু তাতেও বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়।

পশ্চিমা বিশ্বে মহান কনস্টান্টিন নামে খ্যাত প্রথম কনস্টান্টিন (২৭৩-৩৩৭) খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে বিদ্রোহ দমন এবং বাকি শাসকদের পরাজিত করে ‘কনস্টান্টিনোপল’কে রাজধানী করে রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। এটাকে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যও বলা হয়। প্রথম কনস্টান্টিন ৩০৭-৩৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সম্রাট হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকেন।

এই সময় তিনি রোমান সভ্যতাকে পাশ কাটিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। এবং খ্রিস্টধর্মকে জাতীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। রোমান সভ্যতা তখন আস্তে আস্তে খ্রিস্টীয় রীতিনীতি গ্রহণ করতে শুরু করে। একসময় খ্রিস্টবাদ এবং পোপতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠে রোমান সাম্রাজ্যে।

খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে মূল রোমান সাম্রাজ্য অর্থাৎ পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগে প্রবেশ করে রোমান সাম্রাজ্য। পূর্ব রোম সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য তখন হয়ে ওঠে রোমান সভ্যতার ধারকবাহক।

এই শতাব্দীতে পোপদের ক্ষমতায়ন বেড়ে যায়। প্লেটো-আইন্সটাইন দর্শনের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটে। কতিপয় ধর্মীয় গুরু তাদের রীতি অনুসরণ করে যুক্তিবিদ্যার দাবিতে তাদের কথাকে ধর্মীয় স্থানে আসীন করে। তাদের বিরোধিতা ধর্মের বিরোধিতা হিসেবে সাব্যস্ত করে। এই যুগকে পশ্চিমা বিশ্ব ‘অন্ধকার যুগ’ নামে সাব্যস্ত করে। ১৪৫৩ সনে তুর্কি মুসলিম সালতানাতের কাছে পরাজিত হয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। আর এরই মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে মধ্যযুগ বা অন্ধকার যুগের।

পশ্চিমাদের মতে ১৪৫৩ সন তথা পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে আধুনিক যুগের শুরু হয়। পশ্চিমা সভ্যতা তখন খ্রিষ্টধর্মীয় পোপতান্ত্রিক সভ্যতাকে দূরে ঠেলে পূর্বের গ্রিক-রোমান সভ্যতাকে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে। মানবতাবাদকে সামনে রেখে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুগ শুরু হয়। মনুষ্য প্রবৃত্তিকে সবকিছুর মানদণ্ড মানা হয়। এই সময়টাকে রেনেসাঁস বা নবজাগরণের যুগ বলা হয়।

ষোড়শ শতাব্দীতে এসে মানুষ খ্রিস্টধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বের হতে শুরু করে। ধর্মকে সংস্করণের আন্দোলন গড়ে তুলে। সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে তা পূর্ণতা লাভ করে।

সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়—মনুষ্য প্রকৃতি নির্ভর করে জড়পদার্থের ওপর। মানুষের সবকিছু তাই হবে জড়পদার্থ কেন্দ্রিক। আর সেজন্য বলা হলো, সমস্ত জ্ঞানের উৎস যুক্তি। মানুষের যুক্তিতে উন্নিত সবকিছু সঠিক। কোনোকিছু ভালোমন্দের বিচার করলে যুক্তি যেদিক সত্যায়ন করবে সেটাই সঠিক। যা সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে ‘যুক্তিবাদ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। স্যার আইজেক নিউটন (১৬৪৩-১৭২৭) রেনে দেকার্ত (১৫৯৬-১৬৫০) বারুখ স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭) গটফ্রিড লাইবনিৎস (১৬৪৬-১৭১৬) ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) প্রমুখের কল্যাণে যুক্তিবাদ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।

যুক্তিবিদ্যার এই সুক্ষ্ম পাঠের মাধ্যমে মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়—মনুষ্য জীবনে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা শূণ্যের কোটায়। ধর্মের তৈরি বিধিনিষেধ মানারও কোনো প্রশ্ন আসে না। কেননা ভালো-মন্দ সবকিছু নির্ভর করে যুক্তির ওপর। মনুষ্য মস্তিষ্কের ওপর। এভাবে পাশ্চাত্য, ধর্মকে জীবন থেকে পৃথক করে ফেলে।

১৭৮৯ সনের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের প্যারিসের কুখ্যাত বাস্তিলে বিক্ষোভ হয়। ফ্রান্সের রাজতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে ফ্রান্স জনগণের একটি পদক্ষেপ ছিল এটি। এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটে। এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। চার্চগুলোও ধর্মীয় ক্ষমতায়ন ত্যাগ করে মনুষ্য স্বাধীনতার নীতি গ্রহণ করে। এই আন্দোলন পশ্চিমা বিশ্বের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে।

ব্রিটেনের রাজতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে নামে তেরোটি উপনিবেশ। গ্রেট ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সহযোগিতা পেয়ে যুদ্ধে জয়ী হয়। ব্রিটেনকর্তৃক যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়। ১৭৮৭ সনে সংবিধান গৃহিত হয়। ১৭৮৮ সনে অনুমোদপ্রাপ্ত হয়ে পূর্ণ একটি কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে।

পাশ্চাত্য সভ্যতা সবচেয়ে বেশি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (২৮ জুলাই, ১৯১৪–১১ নভেম্বর, ১৯১৮) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
(১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯-২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫) সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে স্নায়ুযুদ্ধ (১৯৪০-১৯৮০) সহ আরও বেশকিছু ঘটনা ছিল পাশ্চাত্যের আধিপত্য বৃদ্ধির মূল কারণ।

পাশ্চাত্য সভ্যতা বিংশ-একবিংশ শতাব্দীতে মুক্তচিন্তার নাম করে এক অদৃশ্য চিন্তার দেয়াল তুলে দিয়েছে মানুষের মনে। চিন্তার জগতে সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সকল চিন্তার ক্ষেত্রে মুক্তচিন্তাকে ঢাল করে, প্রচারণাকে ব্যবহার করেছে নিজ স্বার্থে। উপনিবেশবাদ বিস্তার করেছে গোটা প্রাচ্যে। প্রাচ্যবাদের উপকরণ তাকে সহযোগিতা করেছে—বলা যেতেই হবে।

পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাসটা সংক্ষিপ্ত আকারে টানার চেষ্টা শেষে এখানে আমরা একটু থামব। লক্ষ করুন আমাদের পূর্বোক্ত আলোচনার দিকে। গ্রিক-রোমান সভ্যতার মিশেলে তৈরি মনচাহি জিন্দেগীই কিন্তু বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল প্রতিবাদ্য—মানবতাবাদ। মনুষ্য মস্তিষ্ক বলে এটা ভালো; সুতরাং এটা ভালো। মনুষ্য প্রবৃত্তি এটার কামনা করে; সুতরাং এটা ভালো। যা মূলত গ্রিক-রোমান জড়বাদী সভ্যতার কথ্য। আধুনিককালের অধুনা গণতান্ত্রিক এই সমাজব্যবস্থা গ্রিক-রোমান সভ্যতার নয়া ভার্সন ছাড়া কিছুই না।

আমরা আরেকটি জায়গা লক্ষ করব, যুক্তিবাদ—যুক্তিনির্ভরতা বলছে, আমাদের চিন্তাশীলতা শুধুমাত্র জড়প্রকৃতি ঘীরে হবে। অজড় কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ স্রষ্টা, পরলোক ইত্যাদি কোনো বিষয় হতে পারে না। যা সরাসরি ধর্মদ্রোহীতা।

পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল ভিত্তি তিনটি :
স্বাধীনতা, সমতা, উন্নতি।
এই তিনটি বিষয়কে বিবেচনা করতে হবে আকল দিয়ে। আকলই হবে একক মানদণ্ড। অথচ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এখানকার প্রতিটি বিষয়ের পৃথক মানদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। যেগুলো পুরোপুরি আকলের বিপরিত। ইসলাম তো সবসময় প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার শিকার হতে বাধা দিয়েছেন। অথচ প্রবৃত্তির কামনা-বাসনাকেই পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল কাঠামো ধরা হয়েছে।

তবুও কীভাবে এটাকে ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায়? অথচ ইসলামের সাথে রয়ে গেছে তার মৌলিক দন্দ্ব। ইসলামি গণতন্ত্র আর পবিত্র পেশাব; এ যেন একই বাক্য।

বিজয় বাংলা/এনএ/১৪/১২/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 1
    Share