সংঘবদ্ধ ভাবে কাউকে হত্যার শাস্তি: ইসলাম কী বলে?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১১, ডিসেম্বর, ২০২১, শনিবার
<strong>সংঘবদ্ধ ভাবে কাউকে হত্যার শাস্তি: ইসলাম কী বলে?</strong>

ইমদাদ উল্লাহ আনসারিঃ বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের রায় হলো গতকাল। রায়ের পর থেকে সারা দেশের মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করলেও গুটিকয়েক মানুষ একসাথে এতো জন মানুষের মৃত্যুদন্ডাদেশ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।

তাদের কথা, একজন মানুষকে হত্যার দায়ে ২০ জন মানুষকে হত্যার নির্দেশনা দেওয়া কতটা যৌক্তিক ও আইনসম্মত?

কতটা আইনসম্মত তা আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের রায় থেকে বুঝা যায়। বিচার হয়েছে দেশীয় আইনে। বিচারকরা দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে রায় প্রদান করেন নি। দীর্ঘ সময় নিয়ে অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে রায় দিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। রায়টি দেশে বিদ্যমান প্রচলিত আইনের আলোকেই হয়েছে। কতটা যথাযথ রায় হয়েছে তা আরো বিচার বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

যাইহোক! দেশীয় আইনে কি বলা আছে বা তা কতটুকু ইনসাফ ভিত্তিক তা নিয়ে আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।

একাধিক বা ততোধিক ব্যক্তির দ্বারা কেউ হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হলে, তার বিচার কি হওয়া উচিত? ইসলাম এই সম্পর্কে কি বলে?
এটিই আমাদের আজকের আলোচনার মুল বিষয়বস্তু।

•সর্বপ্রথম আমিরুল মু’মিনীন উমার রাদিআল্লাহু আনহুর সময়কার একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই—

হজরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব রাহিমাহুল্লাহর বর্ণনায় এসেছে যে, উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু ৭ জন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছেন। তিনি তাদের ওপর শাস্তিস্বরূপ ক্বিসাস কায়েম করেছেন। সেই ৭ ব্যক্তি একজন নিরাপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল। সেই সময় মানুষ উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ব্যাপারে অভিযোগ করেছিল যে, এ ৭ জনের কেউ হয়ত হাত কেটেছে, কেউ পা কেটেছে কিংবা কেউ সামান্য যখম করেছে। তাহলে কেন তাদের ৭ জনকে হত্যা করা হবে? উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু মানুষের এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে বলেছিলেন,
لو تمالأ عليه أهل صنعاء لقتلتهم جميعاً
যদি ‘সানাআ’র (ইয়েমেনের রাজধানী) সব মানুষ মিলে হত্যা করতো তবে আমি সানাআ’র সব অধিবাসীকে হত্যা করতাম।’
–মুসান্নেফে আব্দুর রাজ্জাক, মুয়াত্তা মালিক।

•আবু সাইদ খুদরি ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহুমা বর্ণনা করেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আসমান-জমিনের মধ্যে বসবাসকারী সবাই মিলিত হয়ে যদি একজন মুমিনকে মেরে ফেলার কাজে শরিক হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের সবাইকে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’
-তিরমিজি।

• বিদায়াতুল মুজতাহিদ কিতাবের লেখক ইবনে রুশদ এই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘ হত্যাকারী সবার হদ তথা শাস্তি হবে ক্বিসাস বা মৃত্যুদণ্ড। ‘

দলিল হিসেবে উপরে উল্লেখিত উমার রাদিআল্লাহু আনহুর সময়কার ঘটনা উল্লেখ করেছেন।

তিনি যুক্ত করেছেন এই মত জমুহুর ফুক্বাহায়ে কেরামগণের,তাঁদের মাঝে আছেন ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফিয়ী, সাওরী,আহমাদ সহ অন্যান্য ফুক্বাহায়ে কেরাম।
(রাহিমাহুমুল্লাহ)

•আরবের বিখ্যাত ফক্বিহ শায়খ আব্দুল আযিয বীন বায রাহিমাহুল্লাহ এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন حكم قتل الجماعة بالواحد শিরোনামে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, একটি সংঘবদ্ধ দল যদি একজনকে হত্যা করে, তাহলে তাদের শাস্তি কি হবে? তাদেরকে হত্যা করা হবে? নাকি তাদের থেকে ক্ষতিপূরণ বা রক্তমূল্য আদায় করা হবে?

জবাবে শায়খ বীন বায রাহিমাহুল্লাহ বলেছেনঃ-
এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো-
যদি কোন সংঘবদ্ধ দল একত্র হয় একজনকে হত্যার জন্য এবং প্রত্যেকের সহযোগিতায় তাকে হত্যা করা হয়, তাহলে শাস্তিস্বরূপ ঐ সংঘবদ্ধ দলকেও হত্যা করা হবে। শাইখ বীন বায তিনি তাঁর মতের পক্ষে দলিল দিতে গিয়ে উপরে উল্লেখিত উমার রাদিআল্লাহু আনহুর সময়কার ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, এরুপ সংঘবদ্ধ হত্যাকারী দলের বিরুদ্ধে শাস্তিস্বরূপ ক্বিসাস কায়েম তথা তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব। এই বিষয়ে এটাই ইজমাউস সাহাবা ও জমহুর আহলুল ইলমের মত।
আল্লাহু আ’লাম।

ইসলামের বক্তব্য আমাদের সামনে পরিষ্কার। একাধিক বা ততোধিক ব্যক্তির দ্বারা কেউ হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হলে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সবার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কেউ কেউ দ্বীমত করলেও এই সংখ্যাটা একেবারে কম।

সুতরাং আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের রায়ের পর এইটুকু বলা যায় যে,হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত তাদের সবার শাস্তি ক্বিসাস তথা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। এটাই শরয়ী মাসয়ালা। হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সবার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রায় হওয়াতে একে অযৌক্তিক বলার সুযোগ নেই । ইনসাফ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে কি না বা কারো প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কি না এই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। দেশের মানুষ চায় হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের রায় দ্রুত কার্যকর হোক। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হোক। দলীয় চিন্তা ও মতের অমিল হলেই তাকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার সংস্কৃতি বন্ধ হোক।

বিজয় বাংলা/এনএ/১১/১২/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন