আধুনিক সার্জারীর জনক ‘আল-জাহরাভি’

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৪, জানুয়ারি, ২০২২, শুক্রবার
<strong>আধুনিক সার্জারীর জনক ‘আল-জাহরাভি’</strong>

মাজহারুল ইসলামঃ মধ্যযুগে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ যখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন তখন রাতের আকাশে নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল আলো নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নেন আবুল কাসেম খালাফ ইবনে আল-আব্বাস আল-জাহরাভি নামক এক শিশু।

প্রখর মেধাবী ও পরিবারের তত্ত্বাবধানে তিনি উয়ে উঠেন পৃথিবীর ইতিহাসে একজন মহান চিকিৎসক। আল জাহরাভিকে আধুনিক সার্জারীর জনক বলা হয়। তার লিখা ১৫০০ পৃষ্ঠার বিশ্বকোষ “কিতাবুল তাসরিফ”-এর মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তাসরিফ বইটি এতোটাই উন্নত ছিল যে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮০০ সাল পর্যান্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূলপাঠ্য বই হিসেবে কিতাবুল তাসরিফ পড়ানো হতো।

আল জাহরাভি তার ৫০ বছরের চিকিৎসা প্রেক্টিসের অভিজ্ঞতা দিয়ে লিখা বইটি ১০০০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটি ছিল ৩০ খন্ডের বিশ্বকোষ। সার্জারী হতে শুরু করে মেডিসিন, অর্থোসার্জারী, দন্তবিজ্ঞান, শিশু চিকিৎসা, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি, পুষ্টিবিজ্ঞান সবই রয়েছে এই গ্রন্থে।

১২ শতাব্দীর দিকে বইটিকে প্রথম ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন জেরার্ড ক্রেমনা। সবচেয়ে পুরাতন মেডিকেল পান্ডুলিপিটি ইংলেন্ডে লিখা হয় ১২৫০ সালের দিকে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের রিপোর্ট অনুযায়ী তা লিখা হয়েছিলো আল জাহরির পান্ডুলিপির অনুরূপেই।

আল জাহরাভি তার কিতাবুল তাসরিফে প্রায় দুই শতাধিক অস্রেপাচারের সচিত্র বর্ণনা দেন, যা তার সময়কার চিকিৎসকদের বিস্মিত করে তুলে। তার আবিস্কৃত কিছু কিছু যন্ত্র এখনো ব্যবহার হয়। তিনিই প্রথম চিকিৎসক যিনি এক্টোপিক গর্ভধারণ প্রথম বর্ননা করেন। (জরায়ুর বাহিরে গর্ভধারণকে বলা হয় এক্টপিক গর্ভধারণ) এছাড়া মৃত ভ্রুন বের করার যন্ত্রটিও জাহরাভিই প্রথম আবিস্কার করেন।

তিনিই প্রথম লিথোটমি বা কাটাছেঁড়াবিহীন মুত্রথলির পাথর অপসারণ পদ্বতি আবিস্কার করেন। প্রথম হাইড্রোসেফালাস ( মাথা বড় হয়ে যাওয়া রোগ) রোগের চিকিৎসা পদ্বতিও জাহরাভিই আবিস্কার করেন।

নিউরো সার্জারী চিকিৎসায় জাহরাভি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। জাহরাভি ভাবতেন সার্জারী হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল বিষয় কারন সার্জারীর জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই সম্যক জ্ঞ্যানের প্রয়োজন। তাই কিতাবুল তাসরিফের শেষ খন্ডে তিনি সার্জারী নিয়ে আলোচনা করেন। বর্তমানের কসমেটিক সার্জারীকে জাহরাভি “Medicine of Beauty ” নামে কিতাবুল তাসরিফে উল্লেখ করেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড ক্যম্পবেল বলেন,

“আবুল কাসেমের চিকিৎসা পদ্বতি এতোটাই উন্নত ছিল যে ইউরোপীয়রা অন্ধের মতো অনুকরণ করতো তাকে। তার দেখানো পথেই ইউরোপের শল্যচিকিৎসা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে।” ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাক গাই ডি কলিক জাহরাভির শ্রেষ্ঠত্ব কথা বলেছিলেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকা এই বিশাল নক্ষত্রের জন্ম স্পেনের আন্দালুসিয়ার আজ-জাহরা শহরে ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে। ইউরোপের লাইট হাউজ খ্যাত কার্ডোবা শহর হতে ৮ কিমি উত্তরের শহর হল আজ-জাহরা। আল-জাহরাভির পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা কর্ডোবা শহরেই। ইসলামের মূল্যবোধ-ই জাহরাভিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলে। আন্দালুসিয়ার মুসলিম খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকামের রাজ চিকিৎসক ছিলেন তিনি।

কর্ডোবার যে গলিতে তিনি বাস করতেন, সেই গলিটির নাম “আবুল কাসেম স্ট্রিট”। এমনকি জাহরাভির বাড়িটিকে এখনো সংরক্ষিত করে রেখেছে স্পেন সরকার। আধুনিক সার্জারীর জনক এই মহান চিকিৎসকের বাড়ির সামনে একটি ব্রোঞ্জ প্লেটে লিখা আছে – “এটিই সেই বাড়ি, যেখানে আল জাহরাভি বসবাসa করতেন।”

আল জাহরাভিকে সম্মান জানিয়ে আরব আমিরাতে নির্মাণ করা হয়েছে জাহরাভি হাসপাতাল। এভাবেই সকলের মনে সব সময় চির স্মরণীয় হয়ে আছেন জাহরাভি। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজীবন ঋণী হয়ে থাকবে মহান এই মুসলিম চিকিৎসকের নিকট।

১০১৩ সালে নিজ শহর আজ-জাহরাতেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন জাহরাভি। ক্যাস্টিলিয়ান ও আন্দালুসিয়ার যুদ্ধে আজ-জাহরা শহর ধ্বংস হয়ে গেলেও আজো পৃথিবীর বুকে উঁচু হয়ে দাড়িয়ে আছে জাহরাভির হাতে জন্ম নেওয়া আধুনিক সার্জারী।

বিজয় বাংলা/এনএ/১৪/১/২২

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 16
    Shares