কেমন ছিলেন আবরার ফাহাদ, সহপাঠীদের জবানে

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১১, অক্টোবর, ২০২২, মঙ্গলবার
<strong>কেমন ছিলেন আবরার ফাহাদ, সহপাঠীদের জবানে</strong>

বিছানায় হালকা সবুজের ডোরাকাটা চাদর। সিঙ্গেল খাটের স্ট্যানে ঝুলানো শার্ট, লুঙ্গির মতো কিছু একটা। বালিশ এক কোনায়, কাঁথাটা বিছানার মাঝে জড়ো করে রাখা। দেখলেই বুঝা যায় একটু আগেই এখানে ঘুমাচ্ছিল কেউ। টেবিলের বইগুলোও অগুছালো। যেন ঘুম থেকে উঠে তো আবার পড়তে বসারই কথা। খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে আছে একটা ট্রাংক। তাতে সাদা কালিতে লেখা ‘ফাহাদ’। ঠিক ধরেছেন—শেরে বংলা হলের এই ১০১১ নম্বর রুমে থাকতেন আবরার ফাহাদ। সন্ধায় ঘুমিয়েছিলেন, রুমমেটকে বলেছিলেন, নয়টায় ডেকে দিস।

টেবিলে একটা খোলা খাতায় অপূর্ণ রেখে দেয়া অমিমাংসিত অঙ্ক। ঘুম থেকে উঠেই অঙ্কটা মেলাবেন। কিন্তু জীবনের সব অঙ্ক কি মেলানো যায়? জীবনে সব হিসেব, সব অমিমাংসিত রহস্য কি উদঘাটন করা যায়? আবরার ফাহাদ জীবনের শেষ অঙ্কটা আর মেলানোর সুযোগ পাননি। রাত আটট বারো মিনিটে তার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে নিয়ে যাওয়া হল বুয়েট ছাত্রলীগের টর্চাল সেল খ্যাত ২০১১ নম্বর রুমে। ফেসবুক পোস্টের জের ধরে শুরু হলো নির্যাতন। আবরার চিৎকার করলেন ‘মাগো’ ‘মাগো’ বলে, কেউ এগিয়ে এলো না কিংবা আসার সাহস করল না। এতটুকু শরীর আর কতটুকু সয়। পরদিন সূর্য উঠার আগেই এই পৃথিবীকে বিদায় জানায় আবরার ফাহাদ।

বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র ছিলেন আবরার। ক্যাম্পাসের বিখ্যাত না হলেও বন্ধুদের প্রিয়জন ছিলেন নিশ্চয়ই। এখন রুম আছে, পড়ে আছে ব্যবহৃত জিনিসপত্র, পড়ার টেবিল। নাই শুধু মানুষটি। একটা নিঃসঙ্গতার নিদারুণ অনুভূতি যেন কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে ক্যাম্পাসে।

আবরারের কথা জিজ্ঞেস করতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আবরারের ক্লাসমেট তানভীর। তার ভাষ্য, আবরারের তুলনা হয় না। সবসময় মুখে ফুটে থাকতো হাসি। একসঙ্গে ক্লাসে যাচ্ছি, হাঁটতে যাচ্ছি, কোথাও কোনো ঝামেলা দেখলেই দৌড়। রাজনৈতিক আন্দোলন, ব্যক্তিগত রেষারেষি—কোথাও জড়াত না। নিবিড় নিস্তরঙ্গ জলের মতো শান্ত ছিলো সে। রুমে এলেই বসতে দিতো, আপ্যায়ন করতো। সবার সাথেই মিশে যাওয়ার অদ্ভুত এক গুণ ছিল তার।’

কখনো আবরারের কাছ থেকে কষ্ট পাননি?—জানতে চাইবার প্রস্তুতি নিতেই তানভীর চোখটা নামিয়ে বললো, ‘আবরারের চলাফেরা, আচার ব্যবহারে কখনো আমরা কেউ কষ্ট পাইনি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো সে। মসজিদে দেখা হলেই বলতো, কিরে কেমন আছিস?

মাঝে মাঝে এই ‘কেমন আছিস’ নামের ছোট্ট একটি স্মৃতিই বুকের মধ্যে লালন করা ব্যক্তিগত সরোবরে ঢেউ তুলে প্রচণ্ড। তানভীরের ভেতরও নিশ্চয়ই এমন এক ঢেউ তোলপাড় করছে। পৃথিবীর সবচে শক্ত দেয়াল হলো মানুষের বুক। ওই বুকের আড়ালে ঘূর্ণিঝড় বইলেও ওই ভুক্তভোগী মানুষ ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না।

আবরারের আরেকজন ক্লাসমেট শাহেদ। খানিকটা স্বাভাবিক স্বরেই শাহেদ বললো, ‘কখনো তাকে নামাজ ছাড়তে দেখি নাই। সবসময় নামাজ পড়তো। অন্যকে ভালো কাজের আদেশ দিতো এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতো। আজেবাজে কাখনো সময় নষ্ট করতো না।’

আবরারের মাঝে সন্দেহজনক কিছু লক্ষ্য করেছেন জানতে চাইলে শাহেদ বললেন, ‘এমন কিছু সন্দেহজনক দেখি নাই, যার কারণে তাকে এইভাবে পিটিয়ে মারা হয়। আবরার ছিলো দারুণ মেধাবী। তার কথায় মেধার ছাপ লক্ষ্য করা যেতো। সবসময় চুপচাপ থাকতো। নিজে তো ব্রিলিয়ান্ট ছিলোই, পাশাপাশি অন্যকেও ভালো ভালো পরামর্শ দিতো।’

বাঁচতে চেয়েছিলো আবরার ফাহাদ শান্ত নীলীমায় ঢাকা বিকেলের মতো। কিন্তু কিছু বৈশাখী উদ্ধত মেঘ কালো ঝড় নিয়ে এসেছে জীবনে। আবরারের মৃত ছবিটা এখন নৃশংসতার প্রতীক, যেমন পায়রা প্রতীক শান্তির। আবরারের ফেসবুকে বায়োতে লেখা আছে এখনো—’অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা, অসীম মহাকাশের অন্তে।’ সেই যাত্রাটা এমন হবে, আমরা কেউ কল্পনা করিনি। আমাদের কল্পনার বাইরে অনেক কিছু ঘটে যায়।

লিখেছেন ইমরান আবদুল্লাহ।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন