প্রবাস গমনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আদান-প্রদান, হয়রানি ও শিক্ষামূলক গল্প

বিজয় বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১১, জানুয়ারি, ২০২২, মঙ্গলবার
প্রবাস গমনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আদান-প্রদান, হয়রানি ও শিক্ষামূলক গল্প

প্রবাসে যেতে হলে কী রকম হয়রানি, কষ্ট, ত্যাগ স্বীকার ও দালালদের খপ্পরে পড়তে হয়, রিক্তহস্ত হয়ে জীবন হুমকির মুখে পড়ে তার বাস্তবতা নিয়ে এই গল্পঃ

আমি ফয়সাল আহমাদ মাদরাসায় পড়াচ্ছি তিন বছর যাবৎ। টিচিং করে মাসিক যে বেতন মিলতো তা দিয়ে ফ্যামিলি খুব টেনেহিঁচড়ে দিনাতিপাত করতো। তাই প্রবাসে যাবার চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ছুটি থাকাবস্থায়
টাকা কর্জ করে পাসপোর্ট বানিয়ে নেই।

পাসপোর্ট হাতে আসার পর প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনদের মাঝে খোঁজখবর শুরু করি, কেউ বিদেশে আছে কি না। পরে পাশের গ্রামের পরিচিত অনাত্মীয় এক ব্যক্তি, নাম আব্দুল্লাহ সৌদি আরব থাকে, ওর সাথে মেসেঞ্জারে বিদেশ বিষয়ক কথাবার্তা হলো।বহুদিন এভাবে কথাবার্তার পর ফাইনালি ভিসার কন্টাক্ট ঠিক হলো তিনলক্ষ চল্লিশ হাজার টাকায়।আব্দুল্লাহ বললো অরিজিনাল চকলেট ফ্যাক্টরিতে কাজ দেয়া হবে। কোনোপ্রকার সাপ্লাইতে দেয়া হবে না।তার কথা শুনে ভালোই লাগলো। আমিও তার সুন্দর সুন্দর কথাবার্তায় প্রস্তুত হতে থাকি।

মাদরাসায় থাকাকালীন একদিন আব্দুল্লাহ আমাকে ফোন দিয়ে বললো মেডিকেল করার জন্য ঢাকায় যেতে। এবং মেডিকেল খরচবাবদ দশহাজার টাকা সাথে নিয়ে যেতে। মাদরাসা থেকে ছুটি নিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ রাতে কুমিল্লা থেকে ৩ ঘন্টা জার্নি শেষে ঢাকায় পৌঁছলাম। গিয়ে উঠলাম এক বন্ধুর বাসায়।ভোর সকালেই মেডিকেলের জন্য বনানীতে দৌড়ঝাঁপ।মেডিকেল চেকআপের অনলাইন রিসিট এর জন্য তিনঘণ্টা অপেক্ষা করি। শেষপর্যন্ত ওইদিন আর হলো না। ২য় দিন সার্ভার সমস্যা দেখিয়ে বললো আজও হবে না। খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তৃতীয়দিন সকালে অনলাইন রিসিট নিয়ে বারিধারাস্থ এক হাসপাতালে লাইনে দাঁড়িয়ে বিকাল তিনটায় মেডিকেল সম্পন্ন হলো। পরে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে রিটার্ন মাদরাসায় এলাম।

এদিকে করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণ বাধ্যতামুলক হওয়ায় কুমিল্লা (মাদরাসা) থেকেই ঢাকা গিয়ে দু’ডোজ সম্পন্ন করলাম দুইধাপে। পাঁচদিন পর আব্দুল্লাহ ফোন দেয়। ফয়সাল! তোমার মেডিকেল রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে।এখন একলক্ষ টাকা নিয়ে ঢাকায় গিয়ে অগ্রিম জমা দিতে হবে আমার অমুক পরিচিত এজেন্সিতে। তড়িঘড়ি করে টাকাপয়সা চাচা ও আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে রেডি করে চাচা মাসুক মিয়াকে দিয়ে এজেন্সিতে একলক্ষ টাকা জমা করি।

নানান ধোঁয়াশার পর মাসখানেক পর এজেন্সি গত অক্টোবর মাসে ভিসা স্টাম্পিং করে, তখন আব্দুল্লাহ’র কথানুযায়ী এজেন্সিতে আরো একলক্ষ টাকা পরিশোধ করি। ১৫ দিন যেতেই এজেন্সি বললো কারিগরি প্রশিক্ষণ সেন্টার থেকে তিনদিনের ট্রেনিং করে সার্টিফিকেট লাগবে।আমার প্রাতিষ্ঠানিক প্যারা-ঝামেলা থাকায় খুবকষ্ট করে সার্টিফিকেট উঠিয়ে তাদের কাছে জমা করি। আসলো এখন ম্যানপাওয়ার কার্ড সংগ্রহের পালা। এটাতে ও তারা নানান ঝামেলা করেছে। প্রচন্ড বাকবিতণ্ডার পর ১২ ডিসেম্বর ২০২১ ইং ফ্লাইটের ডেইট নির্ধারণ করে এয়ার টিকেট আমার ওয়াটসঅ্যাপ এ পাঠিয়ে দেয়। সময় ঘনিয়ে এলে ফ্লাইটের দুদিন আগেই চাচাকে সাথে নিয়ে, পরিবারের সবার কাছ থেকে অশ্রুসিক্ত হয়ে বিদায় নিলাম। রাতে ঢাকায় এসে আশকোনার একটি হোটেলে উঠলাম। সকাল হতেই চাচাসহ বনানীতে যাই। এজেন্সির লোককে ফোন দিলে সে অন্য একটা অফিসে নিয়ে যায়।

সারাদিন কাটিয়ে করোনা টেস্ট করে রাত ৯ টায় এজেন্সি থেকে ছাড়া পাই। এজেন্সির লোকগুলোর নোংরামি, মিথ্যাচার, অসাদাচারণ ও নাকানিচুবানি খেয়ে শেষমেশ চাচা-ভাতিজা দুজন এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম। ঘুমের চোখ নিয়ে দুজন এয়ারপোর্টেই রাত কাটালাম।সকাল ৬ টা নাগাদ চাচা মাসুক মিয়াকে বুকফাটা আর্তনাদে বিদায় দিয়ে ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করলাম।

বিদেশে আসার পর কষ্টের সাগরে হাবুডুবুঃ

রাত ১১ টায় সৌদির রিয়াদ কিং খালেদ এয়ারপোর্টে প্ল্যান ল্যান্ড করে। সেখান থেকে এক ড্রাইভার আমি ও আরো ছয় সহচরকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এক বাসায় রেখে চলে যায়। রাত পোহালে সবাই শুনতে পাই এটা একটা সাপ্লাই কোম্পানি। পুরাতন লোকেরা বললো- চকলেট কোম্পানি বলতে কিছু নাই। অপরদিকে আব্দুল্লাহ থাকে রিয়াদ থেকে বহুদূরে।
তাকে ফোন দিলে সে কাজের আশ্বাস দিয়ে শান্তনা দিতে চেষ্টা করে। ৫/৬ দিন যাবার পর সকল সহচররা মিলে রান্না করে খেতে লাগলাম। সবাই বাড়ীতে ফোন করে চিল্লাপাল্লা করছে । কেউ কেউ কান্নাকাটি করছে। ১৫ দিন অতিক্রম হবার পর কোম্পানির কিছু লোক এসে ইকামা মোবাইলে দিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে যায়। পরে ফোন করে প্রতিদিনই চিল্লাপাল্লা করছে প্রত্যেকের এজেন্সিকে। এভাবে ৩০ দিন অতিক্রম হবার পর গল্পটি লেখা পর্যন্ত কাজ দেয়া হয়নি আমাদের।

হয়রানি ও ধোঁকাবাজিঃ

দেশের এজেন্সি থেকে ও আব্দুল্লাহকে ফোনকল দিলে কেটে দেয়। এভাবে আমাদের প্রবাসী জীবন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সংশয়। ভিসাদানকারী আব্দুল্লাহ মুখরোচক কথার দ্বারা আমার সাথে ভ্যাল্কিবাজি ও ধোঁকাবাজী করে জীবন নিয়ে সংশয়ে ফেলে দেয়।

মুলত মানুষ নিজের ধনসম্পদ ব্যয় করে আত্মীয় স্বজনদের আঁচলে ঘেরা আদর স্নেহমমতা বিসর্জন দিয়ে প্রবাসে আসে ক্ষণিকের সুখ লাভের জন্যে। শেষ বিদায়ের মুহুর্তটা তো বুকফাঁটা আহাজারি ও আত্মচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে। তা কারো অজানা নয়।

শিক্ষা.

এসব দালালদের খপ্পরে পড়ে কতো মানুষের জীবন সংশয় ও প্রাণনাসের হুমকিতে পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এভাবে ধনসম্পদ ব্যয় করে কতো মানুষ যে রিক্তহস্ত হয়েছে একমাত্র আল্লাহ তাআ’লা ভালো জানেন। কাজেই প্রবাস গমন ও আদান-প্রদান বিষয়ে প্রত্যেকের সচেতনতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

লেখক : ফয়সাল আহমাদ, সৌদি আরব।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 38
    Shares