ওয়াজের ভাষা

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৭, অক্টোবর, ২০২২, শুক্রবার
<strong>ওয়াজের ভাষা</strong>

শীত মৌসুমের ওয়াজ মাহফিল এখন এই অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। যদিও ফিলহাল এইসব মাহফিল, মাহফিলের বয়ান ও আয়োজন নিয়ে নানাবিধ আলোচনা, সমালোচনা অথবা পর্যালোচনা চলছে; তবুও এই ওয়াজ মাহফিলগুলো এই অঞ্চলের মুসলিম সমাজের জন্য জরুরি এক পদক্ষেপ। এমন একটা সহজ দ্বীনের তালিমিব্যবস্থা যারা প্রণয়ন করেছিলেন, তাদের জন্য আন্তরিক দুআ ও শ্রদ্ধা।

জুমার খুতবা ও মাহফিলের মঞ্চ মূলত নবিজির রেখে যাওয়া দ্বীনি উত্তরাধিকার। নবিদের ওয়ারিস হিসেবে আলিমগণ মানুষের তাজকিয়া ও ইসলাহের জন্য দাওয়াত ও তাবলিগের জন্য মিম্বর এবং মাহফিলের মঞ্চকে ব্যবহার করবেন। সেই সঙ্গে পরকালীন মুক্তি ও দুনিয়াবি শান্তির সবক দেবেন। এটাই এইসব মাহফিলের মাকসাদ। আজকে যাঁরা ওয়াজ মাহফিলে বয়ান করছেন এবং মিম্বরে বসে খুতবা দিচ্ছেন, তারা মূলত নবিওয়ালা কাজে তাঁর রেখে যাওয়া সম্মানিত মসনদেই বসছেন। যেই মসনদে বসে নবিজি সাহাবায়ে কেরামকে দ্বীনের সমঝ, জ্ঞান, তরবিয়ত, তাজকিয়া ও ইসলাহে নফসের সবক দিয়েই পৃথিবীকে আমূল বদলে দিতে একদল কর্মী ও কর্মবীর তৈরি করেছিলেন; আজকেও যদি কেউ নববি দরদ, মেজাজ, ইখলাস ও নিয়ত নিয়ে তাঁর উত্তরাধিকার মিম্বর ও মাহফিলের মসনদে বসেন, তাহলে পৃথিবী আমূল বদলে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আরব ব্যবসায়ী থেকে মুহাম্মাদ বিন কাসিম হয়ে উপমহাদেশে ইসলামের সূচনা হয়। মানুষ আদর্শ, কোমল আচরণ আর দরদি ভাষার কারণেই দলে দলে ইসলামের সৌরভে সুরভিত হয়। বিন কাসিম থেকে শাহ জালালে এসে পুরো অঞ্চল ইসলামের শামিয়ানায় আশ্রয় গ্রহণ করে। কীসের শক্তিতে? সেই নবিওয়ালা মেজাজ আর পদ্ধতির কারণেই। তাঁরা কথা বলার সুযোগটাকে নবিজির দেওয়া আমানত মনে করতেন। ফলে তাদের প্রভাবে মানুষেরা ইসলামের নেয়ামতে স্নাত হতে দ্বিধা করত না। শাহজালাল থেকে দারুল উলুম দেওবন্দও একটা দাওয়াতি, ইসলাহি ও বিপ্লবী উত্তরাধিকার বহন করেছে যুগ যুগ ধরে। ফলে, মানুষের অন্তর্গত পরিবর্তন ও ঈমানি চৈতন্যে সরব সচেতনতা তৈরি হয়েছে। দেওবন্দ থেকে উপমহাদেশে ছড়িয়ে যাওয়া অগণিত আলেম ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে নবিওয়ালা কাজের আঞ্জাম দিচ্ছেন।

বাংলাদেশে মোটাদাগে তিনটি পদ্ধতিতে মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করা হয়:—এক. মাদরাসা। দুই. দাওয়াত ও তাবলিগ। তিন. মৌসুমি ওয়াজ মাহফিল। দাওয়াত ও তাবলিগ ছাড়া বাকি দুইটা পদ্ধতি থেকে আরেকটা পদ্ধতিতে মানুষকে দ্বীনের দিকে ডাকা হয়। সেই চতুর্থ পদ্ধতিটি হলো ‘খানকা’।

মাদরাসা:
এই অঞ্চলের মানুষকে দ্বীন ও দ্বীনের আমল শেখাতে, দ্বীনের ওপর চলা শেখাতে মাদরাসাগুলো অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাদরাসা মূলত অ্যাকাডেমিক দ্বীন শিক্ষার কেন্দ্র।

দাওয়াত ও তাবলিগ:
যে-সকল মানুষের যথা সময়ে দ্বীনের ফরজ পরিমাণ ইলম শেখা হয়নি, দ্বীনের ওপর চলতে শেখার অভ্যেস হয়নি, তাদের জন্য দাওয়াত ও তাবলিগ একটি তালিমি দায়িত্ব পালন করছে দীর্ঘকাল ধরেই।

ওয়াজ মাহফিল:
সাধারণ জনগণ ও নারীদের মধ্যে যারা বাইরে যেতে পারেন না। অথবা বাইরে গিয়ে দ্বীন শিখতে পারেন না; তাদের ইসলাহ ও আমল শেখানোর জন্য কাজ করে এই ওয়াজ মাহফিলগুলো। মাহফিলের বক্তাদের দায়িত্ব থাকে মানুষের ভেতরে দ্বীন শেখার স্পৃহা তৈরি করা। আমলের আগ্রহ তৈরি করা। ইসলাহে নফসের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা।

খানকা:
খানকাগুলো বহুমুখী সেবা দিলেও যুগের পরিবর্তনে আজকের অধিকাংশ খানকাই অকেজো অথবা অধর্মের কেন্দ্র হয়ে আছে। যেগুলো এখনো হকের ওপর টিকে আছে, তাদের প্রায় সবগুলোই ইসলাহে নফস ও তাজকিয়ায়ে নফসের প্রচেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো এক্টিভিটিতে তেমন মশগুল হতে পারছে না।

ওপরের আলোচনায় যে-বাস্তবতা ও বর্ণনা আমরা পেয়েছি, বর্তমান সময়ে সেই বাস্তবতা প্রায় নিরুদ্দেশ হয়ে আছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। মাদরাসা, খানকা, দাওয়াত ও তাবলিগ এবং খানকাগুলো এই সময়ে এসে নানা ধরনের সংকট ও সমস্যা মোকাবিলা করছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, বৈশ্বিক, আধ্যাত্মিকসহ নানা ধরনের দুঃখজনক বাস্তবতার মুখোমুখি আজকাল এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠান অথবা কার্যক্রমগুলো।

আজকের নিবন্ধে শুধু ওয়াজ মাহফিলে ওয়ায়েজের বলার ভাষা ও দেহভাষার পলিটিক্স নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করব। হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন—এইখানে আবার রাজনীতি পেয়েছেন কোথায়? পুরো আলোচনার শেষে আশা করি এ-প্রশ্নটা আর আপনার মাথায় থাকবে না।

ওয়াজের ভাষা:
আল্লাহ বলেন,
اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَالۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَجَادِلۡہُمۡ بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ؕ …
অর্থ: ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমত ও সদুপদেশ দিয়ে এবং এদের সঙ্গে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়…।’ (সুরা আন-নাহ্‌ল, ১২৫)
وَمَنۡ اَحۡسَنُ قَوۡلًا مِّمَّنۡ دَعَاۤ اِلَی اللّٰہِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَّقَالَ اِنَّنِیۡ مِنَ الۡمُسۡلِمِیۡنَ-
অর্থ: “কথায় কে উত্তম ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, ‘আমি তো অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত’।” (সুরা হা-মিম আস-সিজদাহ, ৩৩)

নবিজি বলেন: انا افصح العرب ‘আমি আরবদের মধ্যে শুদ্ধভাষী/বাগ্মী’।

ওয়াজের ভাষা হবে দরদি। শিষ্টাচারে পূর্ণ। আদবের পূর্ণ অনুগামী। শুদ্ধ। শব্দে, বাক্যে ও বক্তব্যে থাকবে উম্মতের প্রতি দরদ। প্রয়োজন অনুসারে মৃদু আওয়াজ আবার দরকার হলে উচ্চৈঃস্বরে। ওয়াজ হবে ইসলাহের নিয়তে। তাজকিয়ার প্রত্যাশায়। সত্য জানানোর জন্য। ভুল ঠিক করার জন্য। হালাল-হারাম, জায়েজ-নাজায়েজ, ফরজ-ওয়াজিব, গুনাহ-সাওয়াবের কথা মানুষকে জানানোর জন্য। মানুষের মনোজগতে আল্লাহভীতি ও রাসুলের ভালোবাসা জাগিয়ে একটা রুহানি পরিবর্তন আনাই হলো ওয়াজের মৌলিক উদ্দেশ্য।

ওয়ায়েজের দেহভাষা:
যিনি বয়ান করবেন, তার বডিল্যাঙ্গুয়েজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। এমন কোনো অঙ্গভঙ্গি অথবা ইশারা-ইঙ্গিত তিনি করবেন না, যা সমাজের সাধারণ শিষ্টাচারের বিপরীত। নবীজির নসিহত করার পদ্ধতির বিপরীত। ভুলেও গালি কিংবা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করবেন না। একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রাজি-খুশি করার জন্য বয়ান করবেন। বয়ানের মসনদকে নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার করবেন না। স্থান-কাল-পাত্রভেদে বয়ান করবেন। উগ্রতার চেয়ে বিনীত আচরণ হবে বক্তার মৌলিক যোগ্যতা। যেন তার ভাষা ও দেহভঙ্গি অযাচিত পরিবেশ তৈরি না করে।

সম্প্রতি যতজন তরুণ বক্তা মাহফিলে বয়ানে বাধা-প্রদানজনিত কারণে ভাইরাল হয়েছেন; তাদের প্রায় প্রত্যেকের ভাষা, বডিল্যাঙ্গুয়েজ, এপ্রোচ এবং বিষয় ছিল আক্রমণাত্বক। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বক্তা যেন এইরকমই একটা বাধার অপেক্ষায় ছিলেন। এক বক্তাকে দেখা গেল, তার অসংলগ্নতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজের ‘মাজহারী’ লকবটা বলতে গিয়ে ‘মাদারী’ বলে ফেলেছেন!

দ্বীনি ও ইসলাহি মাহফিলের ভাষা ও উপস্থাপনা ইলমি ও আমলি ঢঙে হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক চিৎকার সর্বস্ব ওয়াজে মানুষের দীর্ঘ মেয়াদে কোনো উপকার আসে না আসলে; বরং মাহফিল শেষে সংক্ষুব্ধ নানা প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়তে হয় আয়োজকদের। একটা বিদ্বেষপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় সমাজে। অথচ ওয়াজের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ভেতরে আরও বেশি দ্বীনের মুহাব্বাত তৈরি করা।

হ্যাঁ, সমাজে কিছু এমন মানুষ সত্যিই আছে, যারা বিতর্ক ও সংকট তৈরির জন্য ওত পেতে থাকে। এমন মানুষদের হিসেব অবশ্যই আলাদা; কিন্তু একজন ওয়ায়েজ অথবা দাঈ যেন গায়ে পড়ে বিতর্ক ও সংকট তৈরি না করেন।

ভাষিক শিষ্টাচার:
ভাষা এমন এক জিনিস, দেখবেন একই বক্তব্য; কিন্তু উপস্থাপনা ও এপ্রোচের কারণে পুরো একশো আশি ডিগ্রি উলটো অর্থ দিচ্ছে। ফলে বয়ানের ভাষাটা হওয়া উচিত পরিশীলিত। আদবপূর্ণ বা শিষ্টাচারে পূর্ণ। ভাষিক এটিকেট সমাজে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শৈশবে যখন আমরা বলতাম—‘আব্বা বাজারে গেছে’। তখন মা অথবা ফুফু সংশোধন করে বলতে বলতেন—‘আব্বা বাজারে গেছুইন’। এইটা বাংলা ভাষার একটা মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বাকভঙ্গি।

আরবি ও ইংরেজিতে আপনি, তিনি নেই। বাংলায় আছে। ফলে বাংলার ক্রিয়াপদে আপনি, তিনি ও সম্মানিত ব্যক্তির জন্য ব্যবহৃত ক্রিয়াপদে ‘এসেছে’ না বলে বলতে হয় ‘এসেছেন’; ‘বলেছে’র পরিবর্তে ‘বলেছেন’; ‘দেখছে’ হয় ‘দেখছেন’; ‘গেছে’র জায়গায় হবে ‘গেছেন’। এই সময়ে প্রায়শই বক্তাদের ভাষায় এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপক সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের ব্যবহারে দীনতা দেখা যায়।

আর এই অপূর্ণতা নিয়ে যখন কেউ কথা বলেন ‘আদ্ব-দ্বীন আন-নাসিহা’র মানসিকতা থেকে, তখনই কেউ কেউ অথবা একদল মানুষ হইহই রব তুলে তেড়ে আসেন। তারা বলেন—‘এইসব ছোট ছোট বিষয় নোটিশ করতে হয়!’ সেই সঙ্গে এইটুকু শুদ্ধতা দাবি করা কোনো আলেম যদি মুরুব্বি হোন, তাহলে তারা চরম আক্রমণাত্বকভাবে বলে থাকেন—‘এইসব নোকতা দেওয়া মূলত ঈর্ষা অথবা হিংসা’-এরই বহিঃপ্রকাশ। আর এই আক্রমণাত্বক ভাবটাই একটা জঘন্য পলিটিক্যাল পার্টিশনের সূচনা করে। তখন এই সুযোগে অগণিত বেনাফিশিয়ারি গ্রুপ নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়।

ওদিকে বক্তা, ভক্তদের আশকারা ও সমর্থনে দেদার বলে যাচ্ছেন। নবীজি, সাহাবি, আহলে বাইত কারও শানেই তখন বক্তার আর সচেতন শব্দ চয়নের দায়বোধ থাকে না। এতে করে সোসাইটিতে দীর্ঘ যুগ ধরে চলে আসা ভাষিক সম্মান প্রদানের রীতিটা বিপন্ন হয়। তরুণদের মধ্যে একটা অভদ্র ভাষা চর্চার বাতিক তৈরি হয়। আর এই ভাষাগত উনতাটা নবীজি ও আহলে বাইতের প্রতি সম্মানের বাধ্যবাধকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে সম্প্রতি আমরা দেখি অনেকেই নবীজির নাম লিখে দরুদ লেখেন না। কেউ আবেগে প্রশ্ন করলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। যেহেতু দরুদ লেখা নয় বলাটাই মাকসাদ, ফলে লেখক আবেগী পাঠককে মাকসাদটা বলে বুঝাতে পারতেন; কিন্তু একটা অশিষ্ট মাইন্ড সেটাপের কারণে সেই লেখক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে এই ক্ষোভ বহুবর্ণের বিচ্যুতি নিয়ে হাজির হয় এইরকম চিন্তার মানুষের কাছে। অবশেষে কারও কারও কাছে শয়তান সফল হয়ে যায়। এরপর কারও কারও ভেতরে আলেম বিদ্বেষ ও হাদিসের অথেন্টিসিটি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকে। এইরকম একটা চেইন ভার্চুয়াল জগতের অভিজ্ঞতায় আমরা—বলা ভালো আমি দেখছি।

বিতর্কিত শব্দের উদাহরণ:
সম্প্রতি আমরা ওরে বাটপার!, সিক্সপ্যাক, উইডো, এই তিনটি শব্দ ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট বিতর্ক দেখেছি। এক বক্তা অন্য বক্তাকে বা বক্তার ভক্তদের উদ্দেশে ‘ওরে বাটপার’ কথাটি বয়ানের মঞ্চে উচ্চারণ করেন।

আরেকজন নবীজির শারীরিক ফিটনেস বোঝাতে ‘সিক্সপ্যাক’ ও খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার হালত বোঝাতে ‘উইডো’ শব্দটি প্রয়োগ করেন। ‘উইডো’ প্রয়োগকালীন বক্তার এপ্রোচ ও দেহভাষাটা অনেকটাই অসম্মানজনক ছিল বলে অনেকেই মনে করেন।

ফলে ভার্চুয়াল পৃথিবীতে একটা ঝড় বয়ে যায়। আর এই ঝড়ের কোথাও কেউ ইখতেলাফের আদব ও শিষ্টাচারের কোনো ধারই ধারেনি। ফলে, পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে।

নবীজির, সাহাবি, আহলে বাইতের ক্ষেত্রে শব্দ ব্যবহারে একজন দাঈকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। সেই সঙ্গে পপুলার বক্তাকে নিজের বয়ানের পাশাপাশি ভক্তদেরকেও দায়িত্বশীল আচরণের জন্য বেশি বেশি কথা বলা জরুরি মনে করি।

রঙ্গ-তামাশা:
ওয়াজের মঞ্চ একটি নবীওয়ালা মসনদ। এই মসনদে বসে কাণ্ডজ্ঞানহীন হাসি-কৌতুক ও রঙ্গরস করা কোনোভাবেই জায়েজ হতে পারে না। আঞ্চলিক ভাষারীতিতে নিজের অঞ্চলে কথা চললেও ভার্চুয়াল মাধ্যমে অবশ্যই সার্বজনীন ভাষারীতিতে বক্তব্য উপস্থাপন করা উচিত।

আজকে যারা ওয়াজের ময়দানকে তামাশা আর অর্থ উপার্জনের মঞ্চ বানিয়েছেন, তারা কাল-কেয়ামতের ময়াদানে নবীজির সামনে কীভাবে মুখ দেখাবেন? আপনাদের এইসব কাণ্ডজ্ঞানহীন রঙ্গ-তামাশার কারণে মানুষ এখন আহলে ইলমগণের কথা শোনে না। ইসলাহি আলোচনা থেকে বিরক্ত হয়ে উঠে যায়। আত্মশুদ্ধির চেয়ে আত্মফূর্তির জন্য মানুষ এখন ওয়াজ শুনতে চায়। এর দায় অবশ্যই কমেডিয়ান ওয়ায়েজদের নিতে হবে।

পারফর্মার নাকি দাঈ:
এই সময়ে অধিকাংশ ওয়ায়েজ দাঈর চেয়ে বেশি পারফর্মার, সেলিব্রেটি, পপুলার অথবা এক্টিভিস্ট। পারফর্মার সব সময়ই নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে কনসার্ন থাকেন। ফলে তার পারফরম্যান্সে সোসাইটিতে কী ইফেক্ট পড়ছে, তা দেখার প্রয়োজন মনে করেন না। আর তাই পারফরম্যান্স ভালো হওয়ার মাঝেই তার সন্তুষ্টি। আমাদের অধিকাংশ বক্তাই এখন পারফর্মার। তাদের বেশিরভাগই শিখতে ও চিন্তা করতে অনাগ্রহী। যে-কারণে তাদের সম্বোধন, বলার ভাষা, দেহভাষা ও অঙ্গভঙ্গি কোনোটাই উম্মতের জন্য বৃহত্তর কোনো কল্যাণ বয়ে আনছে না।

এত এত মাহফিল, অথচ আমরা কী দেখছি! সমাজের পরতে পরতে সুদ আর জুয়া। মুসলমানদের দলের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। মনে হয় প্রতিজন পপুলার বক্তার একটা একটা দল ও কমিউনিটি। বিরোধ বাড়ছে। শোষণ বাড়ছে। অধিকারহীনতার কাল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। মানুষ ইসলামের ভেতরে আছে ভেবেও ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাচ্ছে।

মুসলিম ধার্মিক, আলেম ও উম্মাহ দরদি এক্টিভিস্টদের পৃথিবী সংকুচিত হয়ে আসছে। স্থগিত হচ্ছে তাদের কথা বলার অধিকার। কারণ একটাই, দ্বীনের কথা বলতে গিয়ে ‘বলার ভাষা’ ও ‘দেহভাষার’ সূত্রে যে-বিরোধ ও বিভাজন বিদ্যমান, তাতে সবকিছুই এখন পলিটিক্যাল হয়ে গেছে। আর ক্রমঅধঃপতিত পলিটিক্স সবকিছুকে নিয়েই, এমনকি ধার্মিক ও ধর্মবেত্তাদের নিয়ে আনুপাতিকহারে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

বক্তাকে পারফর্মার না হয়ে দাঈ হওয়া জরুরি। সবাইকে নিজের স্ট্রং জোন জেনে কথা বলাটা উচিত। নিজের জনরার বাইরের প্রসঙ্গটা সেই জনরার বক্তা, দাঈ অথবা আলিমের কাছে রেফার্ড করলে বিভাজন কমবে আশা করি।

বালাগাত-ফাসাহাত আর বাংলায় অলংকার শাস্ত্রটা অকারণ কিছু না। তাই সকল দাঈর উচিত, ভাষিক এটিকেট ও শিষ্টাচার জানা। সেই সঙ্গে ভাষারাজনীতির মারপ্যাঁচটাও বোঝা। নিজের কথায় সমাজের হালত কোন দিকে যাচ্ছে, তা উপলব্ধি করা একজন দরদি দাঈর অন্যতম কাজ।

আল্লাহ আমাদের সকল বিরোধ, ডার্টি পলিটিক্স ও পলিটিশিয়ানদের কবল থেকে মুক্ত করুন। আমিন।

লেখক : সাইফ সিরাজ
কবি ও বিশ্লেষক

বিজয় বাংলা/এনএ/৭/১০/২২

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন