কেমন ছিল প্রিয় নবীজীর দাম্পত্য জীবন?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২৯, ডিসেম্বর, ২০২১, বুধবার
<strong>কেমন ছিল প্রিয় নবীজীর দাম্পত্য জীবন?</strong>

আবু জোবায়েরঃ তাবলীগের বড় একজন মুরুব্বি বাদ ফজর বয়ানের শেষ পর্যায়ে এসে বললেন— “স্ত্রীরাও যেন পরিপূর্ণ দীনের ওপর চলে এর ফিকির করবেন। হাদীসে এসেছে, দুনিয়া পুরোটাই সম্পদ (স্বরূপ) তবে দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ হলো পূণ্যবতী স্ত্রী। (সহীহ মুসলিম: ৩৫৩৫)

তাদের খুব মহব্বত করবেন। তারা আমাদের কাছে আমানত। বাবা-মা কত কষ্ট সয়ে তাদের উত্তম প্রতিপালন করে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাদের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করবেন। ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করবেন। কখনো রাগ দেখাবেন না এবং ধমকের সুরে কথা বলবেন না।”

গুরুত্ব দিয়ে এই কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে– এক জরিপে দেখা গেছে, বিবাহিত নারীদের প্রতি চারজনের একজন স্বামীর নির্যাতনের শিকার। নারী যখন উপেক্ষিত হয় এমন কারো কাছে, যাকে নিয়ে সে তার স্বপ্নের সৌধ নির্মাণ করে, তখন সে ভেঙে পড়ে। সারা দুনিয়া তার কাছে বিষাদিত লাগে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আর আরেক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকতে পারো এবং তিনি তোমাদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সূরা রূম : ২১)

এই আয়াতে এ কথা স্পষ্ট বুঝে আসে যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো শান্তি, স্বস্তি ও ভালোবাসা। আর এ বিষয়গুলো সম্পূর্ণই মানসিক উপাদান, বৈষয়িক উপাদান নয়।

স্ত্রীর মানসিকতার প্রতি লক্ষ রাখা আদর্শ স্বামীর একান্ত দায়িত্ব। যেমন স্ত্রী কোনো কাজ করতে পছন্দ করলে তাকে সে কাজ করার সুযোগ করে দেয়া, তার সাথে রসিকতা করা, তাকে নিয়ে বাড়ির ছাদে বা ঘরের আঙ্গিনায় পায়চারি করা, বৈধ খেলাধুলা করা ইত্যাদি।

একজন নারী তার স্বামীর কাছে শুধু ভাত-কাপড়ের জন্যই আসে না। তাহলে তো ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েদের বিয়েরই প্রয়োজন হতো না। স্বামীর কাছে স্ত্রীর আরো কিছু চাওয়া-পাওয়ার আছে। স্ত্রী চায় স্বামী তাকে ভালোবাসুক, তার প্রতি আলাদাভাবে খেয়াল করুক, তাকে গুরুত্ব দিক, তার সাথে হাসিমুখে কথা বলুক এবং আবেগপূর্ণ আচরণ করুক।

নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ করো।’ (তিরমিজি : ১১৬৩)

আমাদের পূর্ববর্তী অলি-আউলিয়ারা তাদের স্ত্রী-সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন। তবে তাদের এ ভালোবাসা শুধু আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং তারা ভালোবাসতেন এজন্য যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা স্ত্রীদের দায়-দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করেছেন। ফলে তাদের পবিত্র এ ভালবাসায় কখনো ছেদ পড়তো না।

আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেছেন, “মানুষের তাকওয়া ও খোদাভীতি বৃদ্ধি পাওয়ার দ্বারা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাও বৃদ্ধি পায়। কেননা, সে জানে যে– আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তার দায়-দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছে। আমি তা আদায় করতে বাধ্য। এই নিয়তে যখন সে তা আদায় করে তখন সওয়াবের অধিকারী হয়।”

নবীজী (সা.) এর জীবনের প্রতিটি দিকই আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটিয়েছেন। খোশগল্প করেছেন।

নবীজীর দাম্পত্য জীবন কেমন ছিল?

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমিও চাই স্ত্রী আমার জন্য সাজুক।’ (বাইহাকি, হাদিস : ১৪৭২৮)

হজরত আয়েশা (রাদি.) বলেন, ‘তিনি আমাদের মধ্যে এমনভাবে হাসতেন, কথা বলতেন ও বসে থাকতেন, আমাদের মনেই হতো না যে তিনি একজন মহান রাসূল।’

তিনি অন্যত্র বলেন, ‘রাসুল (সা.) ভালোবেসে কখনো কখনো আমার নাম হুমায়রা বা লাল গোলাপ বলে ডাকতেন।’ (ইবনে মাজাহ : ২৪৭৪)

তিনি আরও বলেন, ‘পাত্রের যে অংশে আমি মুখ রেখে পানি পান করতাম তিনি সেখানেই মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে পছন্দ করতেন।’ (মুসলিম : ৩০০)

‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে নবীজি স্বীয় স্ত্রী উম্মে সালমা (রা.)-এর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময় যা অতি কার্যকরী বলে বিবেচিত হয়। (বুখারি, হাদিস : ২৭৩১)

এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো স্ত্রীদের ভৎসনা কিংবা তিরস্কার করতেন না। তাদেরকে কোনো বিষয়ে কটাক্ষ করে কথা বলতেন না। বরং হৃদয় উজাড় করা মায়া ও মন জুড়ানো আকর্ষণীয় ভাবভঙ্গিমায় কথা বলতেন।

তিনি যখন বাহির থেকে ঘরে ফিরতেন তখন অত্যন্ত খুশি মনে মুচকি হেসে ঘরে প্রবেশ করতেন। দরদমাখা কণ্ঠে সালাম দিতেন। কোনো ব্যাপারেই দোষ ধরতেন না। যেভাবে বিছানা প্রস্তুত পেতেন সেভাবেই শুয়ে পড়তেন।

স্ত্রীদের কোনো কথা তার মনের বিপরীত হলে তাদের সে কথা থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে অন্য চিন্তা করতেন। তিনি তাদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাদের আদর, সোহাগ ও মায়া-মমতায় রাখতেন। কখনো কখনো তাদের উরুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়তেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝে মাঝে স্ত্রীদের সঙ্গে বসে বিভিন্ন ঘটনা, কাহিনী ও খোশ গল্প করতেন। সব স্ত্রীই তাকে নতুন নতুন কাহিনী শুনাতেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে নিজেও তাদের কিসসা শুনাতেন।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে নবীজী (সা.) এর আদর্শ অনুসরণে সুখময় দাম্পত্য জীবন গঠনের তাওফীক দান করুন।

বিজয় বাংলা/এনএ/২৯/১২/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 36
    Shares