আজ ঐতিহাসিক বদর দিবস (রামাদান- ১৭)

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৯, এপ্রিল, ২০২২, মঙ্গলবার
<strong>আজ ঐতিহাসিক বদর দিবস (রামাদান- ১৭)</strong>

ওয়াহিদুল হাদীঃ মেঘকে ভেদ করে সূর্যের কিরণ মরুর বুকে এসে অবস্থান নিয়েছে। ছেলে-বাবার, বাবা-ছেলের, চাচা-ভাতিজার, ভাতিজা-চাচার, মামা-ভাগিনার, ভাগিনা-মামার সম্মুখে স্তব্ধ হয়ে কাকতাড়ুয়ার মতন দাঁড়িয়ে আছে। কে জানতো এমন দিন তাদের ভাগ্যে আসবে।
.
বাতাসে বালির সুগন্ধি ভাসছে, প্রখর রোদের ছায়া মস্তিষ্কে যেন ফুটন্ত পানি বিরচন করছে। বাতাসে ভেসে যায় নিরবতার ছোঁয়া।
.
ওমনি করে একপাশ থেকে আওয়াজ আসলো “আমি ঐ প্রান্তের হাউজের পানি পান করেই ছাড়বো” এই বলে লোকটা এগিয়ে যাচ্ছিলো।

প্রতিপক্ষের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা হামজা (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) তার দিকে তীরের ন্যায় তাকিয়ে আছেন। সামনে আসতেই এক কোপে পা কেটে দিলেন। বালিতে মিশ্রিত রক্তের ঘ্রাণের সুভাষ অনেক উৎকৃষ্ট। সবাই বেশ থমকে আছে। নাছড় বান্দা লোকটি আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেই তাকে হত্যা করে ফেললেন।
.
কোরাইশ বাহিনীকে যুদ্ধ থেকে থামানোর জন্য উতবা বেশ কষ্ট করে যাচ্ছে। বারবার কুরাইশদেরকে আত্মীয়দের কথা স্মরণ করিয়ে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার জন্য বুঝাচ্ছিলো কিন্তু আবু জেহেল তা মানতে নারাজ ছিল। কারণ বিজ্ঞ আবু জেহেল তো যুদ্ধের পূর্বে “হে আল্লাহ! আমার মধ্যে যে দল আত্মীয়তার সম্পর্ক অধিক ছিন্ন করেছে এবং ভুল কাজ করেছে, আজ তুমি তাদের ধ্বংস করে দাও।হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল তোমার কাছে অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয়, আজ তুমি তাদের সাহায্য করো” বলে দু’আ করেছে। ফেরার প্রশ্নই আসে না।
.
আবু জেহেল এবার উতবাকে খোঁচা দিতে থাকে। খোঁচা সহ্য না করে নিজ উট থেকে নেমে নিজ পুত্রকে সঙ্গ করে যুদ্ধের ময়দানে অগ্রসর হয়।
.
ময়দানে গিয়ে তারা মুসলিমদেরকে সামনে আসতে হাঁক দেয়। এতে ৩ আনসার সাহাবী সাড়া দিয়ে সামনে গেলে কুরাইশরা বলে যে তারা তাদেরকে চিনে না, তাদের সাথে শত্রুতা নেই তাই যুদ্ধ করার ইচ্ছা নেই। তোমরা বরং চলে গিয়ে আমাদের রক্তসম্পর্কীয়দের পাঠাও।

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবার আলী (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) হামজা (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) ও ওবায়দাকে (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) পাঠালেন। হামজা (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) ও আলী (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) প্রথম রাউন্ডেই তাদের প্রতিপক্ষকে কতল করে ফেলেন।

এদিকে ওবায়দার (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) সাথে প্রতিপক্ষের বেশ একটা যুদ্ধ লেগে যায়। আঘাত বিনিয়মের কারণে তিনি বেশ ঝামেলায় পড়ে যান কিন্তু আলী (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) এসে তাকে সাহায্য করেন এবং কুরাইশ লোককে সেখানেই মাটিতে বসিয়ে দেন।
.
কুরাইশরা হা করে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখের সামনেই তাদের ৩ সহযোদ্ধা শেষ। ক্রোধে হিংসায় তারা সম্মিলিতভাবে মুসলিমদের উপরে ঝাপিয়ে পড়ে।
.
এদিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর কাছে দু’আ করতেই থাকলেন। এমন অবস্থা দেখে আবু বকর (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) এগিয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দিলেন। দু’আ শেষ হওয়ার পরেই ফেরেশতারা আসমান থেকে অবতীর্ণ হোন। ফেরেশতাদের দেখে সুরাকার বেশ ধরে আসা ইবলিশ লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায়।
.
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিমদেরকে আক্রমণের জন্য নির্দেশ দেন। মুসলিমরা বীরবিক্রমে কাফিরদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। সাথে আসমানের দিকে ছুঁড়ে দেন তীর। মুসলিমরা একে একে হত্যা করতে থাকেন। কাফিররা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তাদের উপর যেন মরুর ঝড় আক্রমণ করেছে। এরই মধ্যে তাদের অন্তরে আল্লাহ ভয় প্রেরণ করেন। তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যেতে থাকে।
.
আবু জেহেল খুব চেষ্টা করছিল সবাইকে জড়ো করার জন্য কিন্তু কেউ তার কথায় কান দিচ্ছিলো না। নিরাপত্তার বেষ্টনীতে থাকা আবু জেহেলকে দুই আনসার সাহাবী হুট করে এট্যাক করেন। এক কোপে তার পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয় সে। অন্যদিকে তার দলের সবাই মক্কার দিকে পালিয়ে যেতে থাকে।
.
বিজয়ের হাসি মুসলিমদের মুখের কোণে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদেরকে যেখানে যেখানে মৃত্যু হবে বলে জানিয়েছিলেন তা সাহাবীরা নিজ চোখে উপলব্ধি করলেন। আব্দুল্লাহ ইবেন মাসউদ (ﷺ) আবু জেহেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। মৃত্যুর সন্নিকটে তাকে পেলেন। তার বুকের উপরে পা রেখে এক কোপ দিয়ে উম্মাহর ফেরাউন খ্যাত এই লোককে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন।
.
এদিকে উম্মাইয়াকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) যুদ্ধবন্দী হিসেবে ধরলেন কিন্তু বেলাল তাকে তার হাতে দেয়ার জন্য বললেন৷ এতে তিনি রাজি না হলে বেলাল (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) আরও কিছু আনসারী সাহাবিদের জড়ো করে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করলেন।
.
মুসলিমরা বদর যুদ্ধে বিজয় অর্জন করলেন। মুসলিমদের মধ্যে ১৪ জন সাহাবী শহীদ হলেন। কাফিরদের মধ্যে ৭০ জন মারা গেলো এবং ৭০ জনকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করা হলো। বিজয়ের পরে বদর প্রান্তরে মুসলিমরা কিছুদিন অবস্থান করেন।
.
এদিকে কাফিরদের লাশ এক এক করে কুয়ার মধ্যে ফালানো হলো। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন তারা সত্য পেয়েছে কী না! মুসলিমরা তখন রাসুলুল্লাহর (ﷺ) আশেপাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন।
.
এদিকে মক্কায় কীভাবে পরাজিত মুখ নিয়ে কুরাইশরা প্রবেশ করবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না। একজন বার্তাবহক তারা প্রেরণ করলো। সে মক্কায় চিৎকার দিয়ে প্রবেশ করলো। তার চিৎকারে মক্কাবাসী জড়ো হতে থাকে। সে চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলো অমুক মারা গিয়েছে, তমুকের পুত্র মারা গিয়েছে, তমুক মারা গিয়েছে। লোকেরা হা করে তাকিয়ে আছে। অনেকে ভাবলো সে মজা করছে আর না হয় পাগল হয়ে গিয়েছে। তখন পরীক্ষার জন্য তাকে জিজ্ঞেস করা হলো “সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা” র কী অবস্থা?” দে বললো, সে ক্বাবার হাতিমে বসে আছে এবং তার বাপ-ভাইকে নিচ চোখে হত্যা করতে দেখেছি। এবার সবার টনক নড়লো যে ঘটনা তাহলে সত্য!
.
এদিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় বিজয়ের সুসংবাদ দিয়ে দূত প্রেরণ করলেন। মদিনায় বসে মুনাফিকরা ও ইহুদিরা মুসলিমদের নামে মিথ্যাচার করছিল কিন্তু যেই তারা রাসুলুল্লাহর (ﷺ) উট দেখলেন বাহকের সাথে মুসলিমরা আনন্দের উল্লাস করলেন বিজয় অর্জনের জন্য।
.
এই সময় পর্যন্ত যুদ্ধের গণিমতের মাল নিয়ে কোন আইন নাযিল হয়নি আল্লাহর পক্ষ থেকে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আগের শরীয়াহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। সেই সকল শরীয়াহয়ে গণিমতের মাল নেওয়া হারাম ছিলো এবং সব গণিমতের মাল একত্র করা হতো এবং আল্লাহ আসমান থেকে বিজলি পাঠিয়ে তা জ্বালিয়ে দিতেন।

আল্লাহ পরে আয়াত নাযিল করেছেন গণিমত নিয়ে।
আল্লাহ সূরাহ আনফালের ১ম আয়াত নাযিল করেন “লোকেরা তোমাকে গনীমতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বল, গনীমতের মাল আল্লাহ ও রাসূলের জন্য।” তারপর তিনি মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।
.
এদিকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে কী করা হবে তা নিয়েও রাসুলুল্লাহ (ﷺ) চিন্তিত ছিলেন। তিনি পরামর্শ চাইলেন।

আবু বকর (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) তাকে বললেন “তারা আমাদের আত্মীয়স্বজন। আমার মতে আপনি তাদের কাছ থেকে ফিদিয়া অর্থাৎ মুক্তিপণ নিয়ে ওদের ছেড়ে দিন। এতে যা কিছু নেয়া হবে সেসব কাফেরদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি হিসেবে কাজে আসবে। এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ তাদের হেদায়ত দেবেন এবং তারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।”

এবার উমারের (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) পরামর্শ দেয়ার পালা। তিনি প্রথমেক আবু বকরের (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললেন, “আমি মনে করি যে, আপনি অমুককে আমার হাতে তুলে দিন, আমি তার শিরশ্ছেদ করবো। আলীর হাতে দিন, হামজার হাতে দিন, তারা কাফেরদের শিরশ্ছেদ করবে। এতে আল্লাহ বুঝতে পারবেন যে, কাফিরদের জন্য আমাদের মনে সমবেদনা নেই। আর এসকল যুদ্ধবন্দী হচ্ছে কাফেরদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ।”

উমারের (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) এমন পরামর্শের কারণ হলো, এতে করে সারা আরব মুসলিমদের ভয় পাবে। কিছু কর‍তে গেলে ১০০বার ভাব্বে।
.
দুই জনের পরামর্শ শুনার পর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আবু বকরের (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) পরামর্শ গ্রহণ করলেন। সেই অনুসারে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে।
.
পরদিন সকালে উমার (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) গেলেন রাসুলুল্লাহর (ﷺ) সাথে সাক্ষাৎ করতে। তিনি সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে যান। তিনি দেখলেন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ও আবু বকর (রাদ্বি আল্লাহু আনহু) দু’জনে কান্না করছেন। তিনি তাদের কাছে কারণ জানতে চাইলেন এবং কারণ শুনে নিনেও কান্নায় যোগ দেয়ার জন্য বললেন। সুবহানাল্লাহ! কী ভালোবাসা!
.
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তখন কারণ হিসেবে ফিদিয়া গ্রহণ করার কথা বললেন। আল্লাহ যে আয়াত নাযিল করেন তা পড়ে শুনান। আল্লাহ সূরাহ আনফালের ৬৭-৬৮ নম্বর আয়াতে বলেন “কোন নবীর জন্য সঙ্গত নয় যে, তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে (এবং পণের বিনিময়ে তিনি তাদেরকে মুক্ত করবেন) যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছ, অথচ আল্লাহ চাচ্ছেন আখিরাত। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।” “আল্লাহর লিখন অতিবাহিত না হয়ে থাকলে, অবশ্যই তোমরা যা গ্রহণ করেছ, সে বিষয়ে তোমাদেরকে মহা আযাব স্পর্শ করত।”
.
মদিনায় মুসলিমদের ঘরে ঘরে তখন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছিলো। তারা সবাই মুসলিমদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিমদের নিয়ে বিজয়ীর বেশে মদিনায় প্রবেশ করলেন। মদিনার আসার আগে নজর ইবনে হারিসকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) হত্যার নির্দেশ দেন। সে খুব মারাত্মক অপরাধ করেছিল।
.
মদিনায় প্রবেশ করে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) খবর পেলেন তার কলিজার টুকরো অন্যতম মেয়ে রোকাইয়্যা (রাদ্বি আল্লাহু আনহা) ইন্তেকাল করেছেন। দাফনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিলো। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে চলে যান। নিজ মেয়েকে দুনিয়া থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিয়ে দেন।
.
মুসলিমদের বিজয় দেখে পৌত্তলিকরা ভাবলো আর সময় নষ্ট না করে এক্ষুণি মুসলিম হয়ে যাবে। অনেকে সত্যিকারের মুসলিম হলেও তখন বেশিরভাগই মন থেকে হয়নি।
.
মদিনায় নতুন একটি দলের দেখা দিলো। হ্যাঁ! মুনাফিকের দল!

বিজয় বাংলা/এনএ/১৮/৪/২২

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন